top of page

Kedarkantha Summit : আমার সংগ্রাম ও ইচ্ছেপুরন

Updated: Mar 18


Entire Team on the Summit of Kedarkantha


প্রতিটি মানুষের জীবনে একটা ইচ্ছা থাকে, একটা স্বপ্ন থাকে যা সে পূরণ করতে চায়। সবাই তাদের সেই ইচ্ছা বা স্বপ্নকে পূরণ করতে প্রতি দিন প্রতি মুহূর্ত সংগ্রাম করে চলেছে। তারপরও কারোর স্বপ্ন পূর্ণতা পায় তো কারোর মাঝ পথেই তা ভেঙে যায়। তেমনি আমার জীবনেও একটি স্বপ্ন ছিল থুড়ি এখনও আছে, পাহাড় দেখার। সেই স্বপ্নকে অনেক সময় ভাঙতে দেখেছি কিন্তু কখনো হাল ছাড়ি নি। মনে বিশ্বাস ছিল নিজের স্বপ্ন টা একদিন পূরণ করবই। আমি কখনই শান্তশিষ্ট ঘরোয়া জীবন ঠিক চাই নি। সব সময় একটা adventurous life চেয়েছি আর এর জন্য আমার দাদাভাই আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর "চাঁদের পাহাড়" এর কৃতিত্ব অনেকখানি। কিন্তু ওই যে সব সময় আমরা যা চাই তা পাই না। বিশেষ করে একজন মেয়ের জন্য সেটা একটু হলেও কঠিন। আমার জন্যও তাই বিষয় টা খুব একটা সহজ ছিল না। আমাদের কাছে শোনা সব থেকে common dialogue একটা ছিল "বিয়ে করে বরের সঙ্গে যাবি"। তাই যখনই বাড়িতে নিজের ইচ্ছা বা স্বপ্নের কথা জানিয়েছি তখনই এরকম কথা যে শুনতে হবেই সেটা বলাই বাহুল্য। কখনো কখনো হতাশা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তবুও মনের মধ্যে এক অদম্য জেদ ছিল নিজের স্বপ্নকে ডানা মেলে উড়তে দেওয়ার। আর কথাতেই আছে তুমি মন থেকে যা চাইবে সেটা দেরিতে হলেও একদিন ঠিক অর্জন করবেই। আমার ক্ষেএেও তাই হল। একদিন মা বাবা Dilwale dulhaniya le jayenge এর অমরেশপুরীর মতো বলল "जा बेटी जा.. जी ले अपनी जिंदगी"। আর এর পেছনে সব থেকে বড় অবদান ছিল আমার দিদির, যার কারণে আমার এই স্বপ্ন পূরণ। ওকে ছাড়া সেটা সম্ভব হত না।

নিজের স্বপ্নকে ডানা মেলে উড়তে দেওয়ার জন্য একটা খোলা আকাশ খুবই অভাবনীয় ভাবে পেয়ে গেলাম একদিন। সেদিন আমার সাথে সাথে আমার বাড়ির প্রতি টি মানুষ ভীষণ খুশি হয়েছিল। তখন আমি প্রায় সব সময় গেয়ে চলেছি "आज मैं ऊपर, आसमाँ नीचे; आज मैं आगे, ज़माना है पीछे"। আমার আনন্দ তখন আর দেখে কে! স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আনন্দ।

ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হল। বিগত চার মাস ধরে নিজেকে মানসিক ও শারীরিক ভাবে প্রস্তুত করতে থাকলাম। অবশেষে চার মাস পর সেই দিন টি এলো, স্বপ্ন পূরণের দিন। সেই স্বপ্ন যা আমি বিগত কয়েক বছর ধরে দেখে এসেছি আর নিজেকে সেই জায়গায় ভেবে এসেছি।

4th December অবশেষে বিকেল 5টা নাগাদ Sealdah থেকে উঠে পড়লাম ট্রেনে, গন্তব্য ছিল Delhi। প্রথম বার একা বাড়ি থেকে বেরনোর অভিজ্ঞতাটা অসাধারণ ছিল। নাহ্ ভয় পাই নি এক মূহুর্তের জন্য। একবারের জন্যও মনে হয় নি যে একটা অজানা জায়গায়, কিছু অচেনা মানুষদের সাথে এত গুলো দিন থাকবো যদি কিছু হয়ে যায়! উল্টে ভীষণ রকম excited ছিলাম নতুন জায়গা explore করবো বলে, নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হবো বলে। যাই হোক পরের দিন অর্থাৎ 5th December আমরা Delhi শহরে নেমে সেই দিনই বিকেল 3:20 এর ট্রেনে রওনা হলাম Dehradun এর উদ্দেশ্যে।

Dehradun এ আমাদের বাকি team members রা আগেই উপস্থিত ছিল। ওহ্ আমি তো বাকিদের পরিচয় টাই দি নি; আমাদের পুরো 8 জনের team এ অসীম দা, ধ্রুব দা ,শ্রীস , প্রজ্ঞা দি, ভীনা জি, শ্বেতা জি আর বৈভব দা। তো পরের দিন 6th December সকাল আন্দাজ 9 টা নাগাদ আমরা সকলে Sankri এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম যা Dehradun থেকে 210 km এর দূরত্বে ছিল।

আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে Mussoorie, Damta, Naugaon, Purola, Mori এবং Naitwar হয়ে Sankri এর দিকে এগিয়ে চলল। তারই মাঝে আমরা Mussoorie তে breakfast আর Purola তে lunch সেড়ে ফেললাম। 7-8 ঘন্টা চলার পর সন্ধ্যে নাগাদ আমরা Sankri পৌছালাম। গাড়ির ভেতরে ঠান্ডা টা অনুভব না হলেও যখন গাড়ি থেকে নামলাম তখন হাড়ে হাড়ে টের পেলাম পাহাড়ি ঠান্ডা কাকে বলে। মনে হল হাড়ে হাড়ে যেন ঠকাঠকি লেগে যাচ্ছে।

আমাদের homestay টা একটু ওপরের দিকে ছিল। আমরা সদলবলে যখন পিচ রাস্তা পেড়িয়ে homestay তে শেষ পর্যন্ত এসে পৌছালাম তখন মনে হল এটা আমাদের আগামী তিন দিনের একটা ছোটো খাটো trailer ছিল, पिक्चर अभी बाकी है मेरे दोस्त। তারপর আগামী দিন গুলোতে আমাদের কার্যক্রম কী হবে তা নিয়ে ধ্রুব দা একটা briefing দিয়ে দিল। সেই দিন সবাই খুব ক্লান্ত থাকায় আমরা তাড়াতাড়ি খাওয়া সেড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।


Me Standing with the Mt. Swargarohini peeking from the backdrop


7th December থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হল। সকালে breakfast করে আমরা আন্দাজ 9টা নাগাদ আমাদের প্রথম camp site "Juda ka talab" এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম যা Sankri থেকে 4km এর দূরত্বে 9100 ফুটের উচ্চতায় অবস্থিত। যেহেতু পাহাড়ে আমার এটাই প্রথম আসা তাই এত দিন শুধুই বই এর পাতায় পাহাড়ি রাস্তা, পাহাড়, প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য এসব শুধু পড়ে এসেছি আর কল্পনা করেছি। কিন্তু চাক্ষুষ করার সৌভাগ্য এই প্রথম হল। তাই তখনও বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে আমি নিজের স্বপ্নের পথে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছি।

সকালের নরম রোদের আলো গায়ে মেখে আমরা 8 জন এবং আমাদের local guide ভজন জি পাহাড়ি জঙ্গল Govind Wildlife Sanctuary এর ভিতরের এবড়োখেবড়ো পথ দিয়ে আমাদের journey শুরু করলাম।

এবার একটু রাস্তাটির বর্ণনায় আসি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেই রাস্তা যে সমতলের রাস্তার মতো অত সুন্দর আর মসৃণ হবে না সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ছোটো বড়ো অনেক পাথরে ভর্তি সেই রাস্তার এক পাশে কখনো কখনো পাহাড়ি দেওয়াল উঠে গেছে আর এক পাশে খাদ তো কখনো কখনো আবার উন্মুক্ত জমি। কখনো কোনো জায়গা খুব সহজেই অতিক্রম করে ফেলা যাচ্ছে তো কখনো কোনো জায়গায় খুব সাবধানে পা ফেলে এগোতে হচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় আবার পাথর গুলি পরপর এমনভাবে সাজানো যে যাকে আমরা খুব সহজেই natural stairs বলতে পারি। মনে হচ্ছিল ধরিত্রী মা যেন পথিকদের চলার সুবিধার্থেই এই রাস্তা তৈরী করে রেখেছেন। আর তারই সাথে মাথার ওপরে রাস্তার দুপাশে দন্ডায়মান পাইন আর ওক্ গাছ গুলি নিজেদের ডালপালা বিস্তার করে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা রোদের তাপ থেকে আমাদের প্রশান্তি দিচ্ছিল।


On the way to Juda Ka Talab through the pine forest

কংক্রিটের শহরে শুধু মাত্র গাড়ির আওয়াজ, মানুষের কোলাহল এসবের মধ্যে বেড়ে ওঠা মানুষরা হয়ত জানেও না যে প্রকৃতির নিজস্ব সঙ্গীত জগতের বিখ্যাত সুরকার যথা ঝর্ণার শব্দ, শুকনো পাতার খস খসে আওয়াজ, বরফের ওপর দিয়ে চলার সময়ে মচ মচ আওয়াজ, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর পাখিদের কলকাকলিতে জঙ্গল আর পাহাড় সর্বদাই মুখরিত হয়ে থাকে। সত্যি বড়ই সুমধুর সেই ধ্বনি। সুনলে পরে মন জুড়িয়ে যায়। সেই মন মাতানো সুরে একপ্রকার ভেসে আমরা Juda ka talab এর দিকে এগিয়ে চললাম।

যতই ওপরের দিকে উঠতে থাকলাম চারপাশের দৃশ্য ততই মনোরম হতে থাকল। পাথুরে রাস্তায় চলতে চলতে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম ঠিকই কিন্তু যখনই চারপাশের সেই ছবির মতো অপরূপ সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়লো তখনই কেমন ম্যাজিকের মত সব ক্লান্তি, সব কষ্ট কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম বহু দূর অব্ধি পাহাড় সাড় বেধে দাড়িয়ে আছে ঠিক যেমন ছোটো বেলায় আমরা পাহাড় আঁকতাম ঠিক তেমনি ভাবে। আর তারও পিছনে সাদা বরফে ঢাকা পাহাড় গুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন আকাশের সাথে মিশে স্বর্গ রাজ্যের সীমানা নির্দেশ করছে।


A Cute baby Lamb biting my shoe lace Picture by :- Pragya Mukherjee


প্রকৃতির শোভা কে উপভোগ করতে করতে জঙ্গলের রাস্তা পেড়িয়ে আমরা বেলা 1 টা নাগাদ Juda ka talab camp site এ এসে পৌছালাম। প্রকৃতির রূপ এখানে একটু অন্য রকমের সুন্দর। উন্মুক্ত জমিটি কে চারপাশের ঘন পাইনের জঙ্গল শিশুর মতো আগলে রেখেছে যেন। আর সেই পাইন গাছের ফাঁকা অংশ দিয়ে উকি মারছে দূরের পর্বতমালা। সেখানে বেশ কয়েকটি tent আগে থেকেই ছিল। আমরা নিজেদের ব্যাগ tent এর ভেতরে রেখে একসাথে গোল হয়ে বসে গল্প শুরু করলাম।

Camp site পৌছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সকলে lunch সেরে ফেললাম। তারপর বাকি সময়টা আগুনের কাছে বসে ঠান্ডা হাওয়া গায়ে মেখে প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম।

নতুন জায়গা নতুন মানুষ সব কিছু মিলিয়ে অভিজ্ঞতা অসাধারণ। সবাই একে অপরের কাছে অচেনা হলেও আমাদের মধ্যে একটা অদেখা যোগসূত্র তো অবশ্যই ছিল যে কারণে আমরা সবাই একে অপরের কত আপন হয়ে উঠলাম কয়েক দিনের মধ্যে, যেন কত দিনের চেনা। একটি পরিবার হয়ে উঠলাম।


Beautiful Views of the snowcapped peaks from the trail

Picture by:- Srish Banik

একজন দিদি কে পেলাম প্রজ্ঞা দি, যে আমাকে সব সময় বোন এবং বন্ধুর মতো আগলে রেখেছিল। খুব কম সময়ের মধ্যেই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব টা গড়ে উঠেছিল আর আমরা সব সময়ই একসাথেই থাকতাম। হোটেলে room share হোক বা tent share আমরা একসাথেই ছিলাম। এত দূরে এসে নিজের দিদির অভাব টা বোধ হয় নি। খুব ভালো। শ্বেতা জি, যার কাছে step এর থেকে steep বেশি পছন্দ ছিল। তাই আমিও মাঝে মধ্যে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতাম। অসীম দা, যিনি সব সময় guide করে এসেছেন এবং ওনার sporting nature আমাদের সকলকে মুগ্ধ করেছে। ট্রেকের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষটির মধ্যে কোনো ক্লান্তি ভাব দেখি নি আর সেটাই আরও বেশি করে অবাক করেছে। শ্রীস, শান্তশিষ্ট একটি ছেলে, কথা খুব একটা না বললেও অসাধারণ ছবি তুলতে পারে। তার নিজেরও অভিজ্ঞতার ঝুলিও নেহাতই কম নয়। ভীনা জি, আমাদের মতো ছেলে-মেয়েদের কাছে উনি একজন উদাহরণ হয়ে থাকবেন চিরকাল। কী অসম্ভব মনের জোর আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে শত প্রতিকূলতা স্বত্ত্বেও পাহাড়কে যে জয় করা যায় তা ওনাকে দেখে শিখেছি। তাই ওনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম। বৈভব দা, একজন প্রাণোচ্ছল মানুষ, সবাইকে হাসি মজাতে মাতিয়ে রেখেছিল। আর last but not the least, ধ্রুব দা যাকে ছাড়া এই trek অসম্পূর্ণ। শুধু অসম্পূর্ণ না, যাকে ছাড়া আমার পক্ষে এই journey টা অসম্ভব হয়ে যেত। স্বপ্ন টা অপূর্ণ থেকে যেত। আমার স্বপ্ন পূরণের পিছনে আমার বাড়ির লোকের সাথে সাথে এই মানুষটির অবদানও কিছু কম নয়। কী অসম্ভব ধৈর্য্য, কী অসম্ভব মানুষকে motivate করার ক্ষমতা, সত্যি অতুলনীয়। তোমার থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। তোমার জন্য রইল অনেক শ্রদ্ধা।


Juda Ka Talab Campsite on a bright moonlit night

Picture by Srish Banik

সেই দিনের মতো আমরা সকলে 8 টার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে যে যার tent এ গিয়ে শুয়ে পড়লাম। পাহাড়ে শীতকালে রাত নামে ঝুপ করে। রাত মানেই তা সুন্দর আর রহস্যে ভরা। কিন্তু পাহাড়ে রাত টা যেন অনেক বেশি সুন্দর আর অনেক বেশি রহস্যময়। শহরে বসে আমরা তো হামেশাই চাঁদ দেখি কিন্তু তার সৌন্দর্য কে কতটাই বা বুঝতে পারি আর কতটাই বা উপভোগ করতে পারি। বড়জোর রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে একবার মাথা তুলে চাঁদের দিকে তাকাই । কিন্তু ওই একবার তাকালেই কি তার আসল সৌন্দর্য কে বোঝা যায় নাকি আমাদের তখন ওতো সময় থাকে চাঁদকে নিয়ে কাব্য করার? চাঁদ বাস্তবিকই যে কত সুন্দর তা পাহাড়ে না আসলে কখনো জানতে পারতাম না। মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি চাঁদের আলোতে নিজের অন্ধকার কে মুছে দিচ্ছে। জ্যেৎস্না যেন তার আলোর বাঁধ ভেঙে দিয়ে তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। চাঁদের সেই রূপ দেখে শ্রী মান্না দে এর গাওয়া একটি গান মনে পড়ছিল "ও চাঁদ.. সামলে রাখো জোছনাকে, কারো নজর লাগতে পারে; মেঘেদের উড়ো চিঠি, উড়েও তো আসতে পারে"। সেই আলোয় অন্ধকার মুছে গেলেও দূরের পাইন গাছের জঙ্গলে আলো আধারি সৃষ্টি করে রাত টাকে আরো অনেক বেশি রহস্যময় করে তুলেছিল।


Starlit Sky in Juda Ka Talab Campsite Picture By Srish Banik


পাহাড়ে রাতে নাকি ঘুম হয়ে না, বারবার ঘুম ভাঙে, কথাটা শুনেছিলাম বটে কিন্তু পরে বুঝেছিলাম কথাটা কত টা সত্যি। কোনো এক অজানা কারণে বারবার রাতে তাই ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। আর যখনই ঘুম ভাঙছিল তখনই শুনতে পাচ্ছিলাম বাইরে হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ।

8th December সকালে ঘুম থেকে উঠে 9 টার মধ্যে breakfast করে আমরা আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল Kedarkantha base camp এর উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরলাম যা Juda ka talab থেকে 4km এর দূরত্বে 11250 ফুটের উচ্চতায় অবস্থিত। রাস্তার চড়াই এখানে একটু বেশি। বড় বড় বোল্ডার, ছোটোখাটো অনেক পাথরে ভর্তি রাস্তাটা কে পাইনের জঙ্গল চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। সেই জঙ্গল ভেদ করে সূর্যের আলো কখনো মাটি স্পর্শ করছে তো কখনো আলো আধারি সৃষ্টি করছে। কখনো আবার দূরের কোনো লুকোনো ঝর্ণা থেকে ভেসে আসছে জল তরঙ্গের সুরেলা শব্দ। মাথার ওপর পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ পাহাড়ি নিস্তব্ধতা কে ভেঙে দিচ্ছিল। আর তারই সাথে যোগ দিয়েছিল মাটি বুনো গাছ গাছালির মিশ্রিত একটা অদ্ভুত গন্ধ। সেই গন্ধটা কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দেয়। হ্যাঁ নেশাই বটে, মনে হয় যেন নেশা করে এখানেই পড়ে থাকি। সারা শরীর মন জুড়ে এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়িয়ে দেয়।


Mt. Swargarohini as seen from trails

Picture by :- Srish Banik

এভাবেই ধীরে ধীরে চড়াই উঠে দুপুর আন্দাজ 1:30 টা নাগাদ আমরা base camp এ এসে পৌছালাম। যতই ওপরের দিকে উঠছিলাম চারপাশের দৃশ্যও যেন ততই পাল্টে যেতে লাগল। আর base camp এ আসার পর এখানে প্রকৃতির রূপ যেন এক অন্য রকম মাত্রা নিল। নীচের জঙ্গল পেরিয়ে আমরা একসময় এসে পৌছালাম এক উন্মুক্ত বিস্তৃত জমিতে যাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে উঁচু উঁচু পাইনের জঙ্গল আর পর্বতমালা। এক অপরূপ মনমুগ্ধকর দৃশ্য শরীর আর মনের সমস্ত ক্লান্তি কে ধুয়ে মুছে দিল আর তারই সাথে এক ঠান্ডা হাওয়া যেন আমাদের আলিঙ্গন করে স্বাগত জানাল নিজের দুনিয়ায়। সেখানে জায়গায় জায়গায় বরফ পড়ে আছে আর আবহাওয়াও অত্যন্ত ঠান্ডা। নীলচে আকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ গুলো এমন ভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে যে দেখে মনে হচ্ছে কেউ সুনিপুণ হাতে সেগুলো কে আকাশের গায়ে লাগিয়ে দিয়েছে। আর বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের সারি গুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো এক স্বপ্ন রাজ্যের অধিবাসী।

সেখানে পৌছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলে মিলে নীল আকাশের নিচে বসে, রোদের তাপ গায়ে মেখে আর চারপাশের মনোরম দৃশ্যকে উপভোগ করতে করতে মধ্যাহ্নভোজন সেরে ফেললাম।


Lunch at Kedarkantha Base Camp

প্রকৃতির মাঝে চুপচাপ বসে থাকলে সময় যে কীভাবে বয়ে যায় তা বোঝাই যায় না। দুপুরের খাওয়া শেষ করে এরকমই চুপ করে বসে আছি, দেখলাম কখন যেন আকাশের নীল রঙ ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে গোলাপি হতে শুরু করেছে। সূর্যাস্ত আমরা সবাই দেখেছি। কখনো ঘরের জানালা দিয়ে তো কখনো ছাদ থেকে। আবার কখনো সমুদ্রের ধারে বসেও দেখেছি। কিন্তু 3429 মিটার উচ্চতায় বসে সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতি যে কত টা সুন্দর তা বর্ণনা করতে গেলে আমাকে সেই উচ্চমানের কবি হতে হবে, যা কিনা আমি নই।

পড়ন্ত বিকেলের আকাশকে গোলাপী, বেগুনী, কমলা আভায় রাঙিয়ে সূর্যদেবের পশ্চিম আকাশে অস্ত যাওয়া পৃথিবীর এক অন্যতম সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য। আর তা পাহাড়ের কোলে বসে চাক্ষুষ করার অনুভুতি টাও অসাধারণ। সূর্যাস্তের সময় আকাশে তখন চলে বিভিন্ন রঙের খেলা আর সেই রঙের আভা আকাশ, মেঘ, জঙ্গল, পাহাড়ের সাথে সাথে মানব হৃদয়কে ও রাঙিয়ে দিয়ে যায়। দূরের সেই সাদা বরফে ঢাকা পর্বতমালা গুলো ও তখন সূর্যাস্তের রঙিন আভায় নিজেকে রাঙিয়ে তোলে। প্রকৃতিও যেন সেজে ওঠে এক অপরূপ রূপে। সেই অস্তমিত সূর্যের অপরূপ সৌন্দর্য কে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমাদের কারোর নেই। তাই আমি বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম সেই অস্তমিত সূর্যের দিকে আর তার সাথে মনে মনে গেয়ে উঠলাম "রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে"। আর এক সময় সারা শরীর মন জুড়ে এক ভালোলাগার প্রলেপ লাগিয়ে সূর্যদেব ধীরে ধীরে বিদায় নিলেন।


Beautiful View of Sunset from Kedarkantha Base Camp Picture by:- Pragya Mukherjee


সূর্য অস্ত যেতেই ঠান্ডার মাত্রা টা যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। এই অবস্থায় আর বাইরে বসে থাকা চলে না। তাই আমরা সকলে tent এর ভেতর গিয়ে বসলাম। বলে রাখি বাইরের তুলনায় tent এর ভেতর টা অনেক গরম, তাই ভেতরে ঢুকতেই অনেক আরাম বোধ করলাম।

পাহাড়ের উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে যেমন চারপাশের দৃশ্য মনমুগ্ধকর হতে লাগল ঠিক তেমনি চাঁদের সৌন্দর্য ও আরও বাড়তে লাগল। চন্দ্রদেব যেন তখন মেঘেদের সাথে মিলে লুকোচুরি খেলতে লাগল। আর আমরা সকলে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা ভুলে সেই খেলা দেখতে লাগলাম।

সেদিন আমরা সন্ধ্যে 6:30 টা নাগাদ রাতের খাওয়ার সেরে ফেললাম কারণ তার পরের দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খাওয়ার পর দাদা পরের দিনের পরিকল্পনা কি সেটা বুঝিয়ে দিল। তো আমরাও সেই মতো সন্ধ্যে আন্দাজ 7:30 টা নাগাদ ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম।


A beautiful Moonlit Night and clouds from Kedarkantha Base Camp

Picture :- Pragya Mukherjee

9th December রাত 2:45 এ আমরা সকলে ঘুম থেকে উঠে কিছু খেয়ে তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। রাতের অন্ধকারে আকাশকে যেন অনেকটা তারায় পরিপূর্ণ কালো গালিচার মত দেখতে লাগে। আর সেই তারায় ভরা আকাশে মেঘেদের ভেলার মধ্যে লুকোচুরি খেলে বেড়াচ্ছেন স্বয়ং চন্দ্রদেব। তার যেন তখন বাঁধ ভাঙা রূপ। জ্যোৎস্নার আলো চারপাশের মলিনতাকে ধুয়ে দিতে লাগলো।

সেই চাঁদের আলো আর টর্চ কে সঙ্গী করে আমরা পথ চলতে শুরু করলাম। মাথার ওপর তখন সপ্তর্ষি মন্ডল আর ধ্রুব তারা রইল আমাদের পথ নির্দেশ করার জন্য। এভাবেই প্রকৃতিকে সঙ্গী করে আমরা ধীরে ধীরে পথ চলতে চলতে একসময় উন্মুক্ত ভূমি ছেড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। যথারীতি জঙ্গলের মধ্যে চাঁদের আলো এসে না পড়ার কারণে চারদিক টা ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল।

সেই পরিস্থিতিতে টর্চের আলোর ওপর ভরসা রেখে পাথুরে রাস্তা দিয়ে ওপরে উঠতে থাকলাম। সেই আলোর বাইরের পরিধি ছিল আলকাতরার মতো অন্ধকার। মাথার ওপরের বড় বড় পাইন গাছ গুলি যেন নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে চাঁদের আলোকে ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিল। আর ঠান্ডার মাত্রা টাও যেন বেড়েই চলেছিল।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা 9 জনের দলটি ওপরের দিকে এগিয়ে চললাম। চলার সুবিধার্থে দলটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। চারজনের দ্বিতীয় দল টাতে ছিলাম আমি। ওপরে ওঠার কষ্ট ছাড়া আর কোনো কষ্ট ছিল না, আর সেই কষ্ট টাও দূর হয়ে যাচ্ছিল যখন চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পরে চারপাশের দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। কী অসম্ভব সুন্দর সেই দৃশ্য।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলার সময় কোনো বাধার সম্মুখীন যে হতে হয় নি তা নয় কিন্তু সেই সমস্ত বাধা আমরা ধীরে ধীরে অতিক্রম করতে পেরেছিলাম। খুব স্বাভাবিক ভাবেই পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তা যে শৌখিন ভ্রমণের পার্ক নয় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দুপাশে উচুঁ উচুঁ গাছের সারি আর তারই মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার সরু পথ। পথ কোথাও সমতল নয়। সেই পথের কোনো কোনো জায়গা পুরোটাই বোল্ডারে ভর্তি আবার কোনো কোনো জায়গায় বরফ জমে শক্ত হয়ে আছে। কিছু কিছু জায়গায় Verglas ও ছিল অর্থাৎ জলের ওপর একটা পাতলা বরফের আস্তরণ। সেটাকেও বাঁচিয়ে খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিল। আবার কোনো কোনো জায়গায় বোল্ডারের ওপর বরফ এমন ভাবে জমে শক্ত হয়ে আছে যে সেখানে আর পা রেখে ওঠার জো নেই। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সেখান টা পেড়িয়ে যেতে হচ্ছিল। কিন্তু তার মধ্যেও বোল্ডারের জায়গা গুলো পেড়িয়ে যেতে কষ্ট হলেও সবথেকে কঠিন লেগেছে জমে শক্ত হয়ে থাকা বরফের ওপর দিয়ে হাটতে। সেখান দিয়ে অতি সাবধানে পা ফেলে চলতে হচ্ছিল কারণ সেগুলো খুবই slippery। বেশ কয়েকবার পা পিছলে পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেছি।


Summit Walk at night around 3:30 AM

Picture by:- Srish Banik

-2 বা -3 ডিগ্রি তাপমাত্রা বলতে ঠিক কতটা ঠান্ডা সেটা ঘরে বসে আন্দাজ করা আর পাহাড়ে সেই কনকনে ঠান্ডার সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। সেই কনকনে হাড় কাপানো ঠান্ডা, হিম শীতল হাওয়া, অন্ধকার জঙ্গলের অসমতল রাস্তা, ক্রমশ বেড়ে চলা চড়াই আর তারই সাথে দৈহিক কষ্ট, প্রকৃতি যেন প্রতি পদে পদে আমাদের দিকে challenge ছুড়ে দিচ্ছিল। আর আমরা এই এত প্রতিকূলতাকে এক এক করে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আর যতই অগ্রসর হতে থাকলাম প্রকৃতিও যেন ততই তার রূপের ডালি আমাদের কাছে মেলে ধরতে লাগলো।

এইভাবেই একসময় জঙ্গলের রাস্তা পেরিয়ে খোলা জমিতে এসে পৌছালাম। সত্যি বলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। নিজের হৃদস্পন্দন যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম। সমতলের মানুষ যখন হঠাৎ করে পাহাড়ে আসে আর এতটা চড়াই ওঠে তখন তার এমন নাভিশ্বাসই ওঠে। সেই খোলা জমিতে পৌছানোর পর যখন মনে হচ্ছিল যে আর হয়ত পারব না, দৈহিক কষ্টে যখন একপ্রকার হাড় মানতে শুরু করেছি ঠিক সেই মূহুর্তেই ধ্রুব ডা বলে উঠলো "পেছনে একবার তাকিয়ে দেখো"। সাথে সাথে পিছন ফিরে যা দেখলাম তা কখনো ভুলবো না। হয়ত আগামী দিনে তার থেকেও অপরূপ সুন্দর দৃশ্য দেখবো কিন্তু প্রথমবার পাহাড়ে এসে দেখা সেই অসামান্য দৃশ্যকে কখন মন থেকে মুছে ফেলতে পারবোনা। আগেই বলেছিলাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "চাঁদের পাহাড়" ই আমাকে একপ্রকার পাহাড়ে এনে ফেলেছে। তাই পিছনে ফিরে আমি যেন সেই "চাঁদের পাহাড়" কেই চোখের সামনে দেখতে পেলাম। বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে তা যেন চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। চাঁদের পাহাড় সত্যিই ধরিত্রী তে নেমে এসেছে। তার সৌন্দর্যের প্রকৃত বর্ণনা করা আমার পক্ষে খুব একটা সহজ কাজ হবে না। তাই মুগ্ধ নয়নে আমি শুধু তাকেই দেখতে লাগলাম। সেই দৃশ্যকে ক্যামেরা বন্দী করার বদলে মানস চক্ষে ধরে রাখলাম।

জানি মাঝে মধ্যে হয়তো আমি একটু বেশিই কাব্যিক হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছি কিন্তু কী করব চোখের সামনে যা দেখেছি যা উপলব্ধি করেছি তাকে ঠিক ভাবে ভাষায় প্রকাশ করতে এইটুকুর দরকার হয়ত আছে। তথাকথিত সাহিত্যিক তো আর নই তাই ভূল ত্রুটি অনেক হচ্ছে। আসলে পাহাড় আমাকে লিখতে শেখাচ্ছে।

সেই অপার্থিব মনমুগ্ধকর দৃ্শ্যে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম যে শারীরিক কষ্টের কথা তখন বেমালুম ভূলে গেলাম। সারা দেহ মন জুড়ে থাকা ক্লান্তি ওই অসামান্য দৃশ্যের কাছে হাড় মানতে বাধ্য হয়েছিল। সর্বাঙ্গ জুড়ে তখন এক অদ্ভুত ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আর সেই সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস আমাকে আলিঙ্গন করে কানের কাছে ফিশ ফিশ করে যেন বলে গেলো "এই তো আমি। তোর তপস্যা যে আজ সার্থক। ভালো করে চেয়ে দেখ সামনে।" ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে গেল। সেই ভালোবাসা যার ছোঁয়ায় আবার নতুন করে নতুন উদ্যমে পথ চলার শক্তি সারা দেহে সঞ্চারিত হতে থাকলো। কারণ সামনে যে তখন অনেকখানি পথ বাকি ছিল।

চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যকে উপভোগ করতে করতে আমরা আবার পথ চলা শুরু করলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর একটা ছোট মত ধাবা পেলাম। সেখানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা সকলে Kedarkantha Summit এর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম।

মানুষের জীবনের সাথে পাহাড়ি রাস্তার এক অদ্ভুত মিল আছে। মানুষের জীবন যেমন ভালো মন্দের সংমিশ্রণে তৈরি তেমনি পাহাড়ি রাস্তাও চড়াই উৎরাই তে পরিপূর্ণ। জীবনের পথে চলতে গিয়ে যেমন বাধার সম্মুখীন হতে হয় আবার সেই বাধাকে অতিক্রম করে এগিয়েও যেতে হয়, থেমে গেলে চলে না বা ফিরে যাওয়ার রাস্তা থাকে না, তেমনি পাহাড়ের রাস্তায় চলতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়ে হাড় মেনে পিছিয়ে আসলে চলে না। আমাদের চলার পথেও সেরকম কিছু বাধার সাথে মোকাবিলা করতে হয়েছে। সবথেকে বেশি লড়তে হয়েছিল কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার সাথে। পর্বত শিখরের দিকে যত এগোতে থাকলাম পথ ততই খাড়া হতে লাগল। সোজা ভাবে আর ওঠা যাচ্ছিল না। আকা বাঁকা পথে উঠতে হচ্ছিলো। সেই পথে চলতে গিয়ে কতবার মনে হয়েছে যে আর পারব না এখানেই বসে থাকি। আর যখনই প্রকৃতির ছোড়া challenge এর কাছে একপ্রকার হাড় মেনে বসে পড়েছি তখনই একজন "হাল ছেড়ো না বন্ধু" বলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়ে গেছে।


On the way to the Summit, with snow on the trails and the sun about to rise

পায়ের তলায় বরফের চাদর আর মাথার ওপর নক্ষত্র খচিত আকাশ এই দুয়ের সমন্বয়ে রাতটা যেন হয়ে উঠেছিল কোনো এক পরী রাজ্য। আর তেমনি রহস্যময়। এই রকম এক রোমাঞ্চকর পরিবেশে চড়াই উঠতে উঠতে একসময় লক্ষ্য করলাম অন্ধকারের চাদর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আকাশে আলোর রেখা ফুটতে শুরু করেছে। আকাশের রঙও ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে পর্বত শিখরের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আগত। সূর্যদেবের নিদ্রা ভঙ্গের সময় হয়েছে।

কিন্তু তখনো চূঁড়ায় পৌছাতে অনেকটা পথ বাকি ছিল। তাই আমরা যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এগোতে থাকলাম। কিন্তু তাড়াতাড়ি করলেই কী আর তাড়াতাড়ি সব হয়! প্রতি পদে পদে দেহ মন বিদ্রোহ করতে লাগলো আর রাস্তা বাধ সাধতে লাগলো। তবে সেই সব বাধাকে অতিক্রম করে আমরা সবাই একে অপরের অবলম্বন হয়ে শেষ পর্যন্ত শিখর জয় করতে পেরেছিলাম। কারণ একটা কথা বুঝেছিলাম যে যতই প্রতিকূলতা আসুক না কেন পর্বতরাজ হিমালয় কখনো হেরে যেতে দেন না। ঠিক জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যান।

12500 ফুট! অবশেষে শরীর, মন, রাস্তা এবং সর্বোপরি ঠান্ডার সাথে একরকম লড়াই করে আমরা সবাই কেদারকন্ঠ শিখরে আরোহণ করতে সফল হয়েছিলাম। একাধারে স্বপ্ন পূরণ আর সব বাধা পেড়িয়ে শিখর জয়ের আনন্দ, সে এক অসামান্য অভূতপূর্ব অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। নিজের স্বপ্নকে চোখের সামনে পূরণ হতে দেখে তখন আমি আনন্দে আত্মহারা। সেখানে পৌঁছে কেউ অবাক নয়নে প্রকৃতির রূপকে নিরিক্ষন করছে তো কেউ সেই অপরূপ শোভাকে ক্যামেরা বন্দী করার চেষ্টা করছে। আর আমি আর দি দুজনেই সেই জগতে এতটাই বিভোর হয়ে গেলাম যে কখন আপনা হতেই আমাদের চোখ থেকে আনন্দাশ্রু ঝড়তে লাগল তা বুঝতেও পারলাম না।


Sunrise from Kedarkantha Top

এতটা উচ্চতা থেকে সূর্যোদয় দেখার অনুভূতি টা ছিল খুবই রোমাঞ্চকর। চোখের সামনে কীভাবে যেন আকাশের রঙ বদলে যেতে লাগল। হঠাৎ মনে হলো কোনো ষোড়শী মেয়ে লজ্জা পেলে তার গাল যেমন রাঙা হয়ে ওঠে, ঠিক তেমন ভাবেই মেঘের একটা কিনারা লাল হয়ে উঠেছে। ঠিক লাল নয়, কমলা। ধীরে ধীরে দূরের পর্বতমালার পিছন থেকে সূর্যদেব আবির্ভাব হতে লাগলেন। আর সেই আলো মেঘের মধ্যে দিয়ে বিচ্ছুরিত হতে লাগল গোটা আকাশ জুড়ে। যেন আলোর মেলা। সেই অদ্ভুত অপার্থিব দৃশ্য শরীর আর মনের সমস্ত ক্লান্তি কে যেন নিমেষের মধ্যে শুষে নিল। সেই দৃশ্য এতটাই নৈসর্গিক যে তার বর্ণনা একমাত্র শব্দ ভান্ডারে পরিপূর্ণ কোনো কবি ই করতে পারবেন হয়ত। তাকে ক্যামেরা বন্দী করে রাখা যায় না। কিন্তু মনের ক্যামেরায় সেই অপার্থিব শোভা আমৃত্যু থেকে যায়।


View of Mt. Swargarohini during sunrise from the summit

আমি তো আকাশে একই সঙ্গে চন্দ্র ও সূর্য কে দেখে আরো বেশি বিভোর হয়ে গেলাম। মোহিত হয়ে গেলাম দূরের স্বর্গারোহিনীর রূপ দেখে। পূরাণ মতে সেখান থেকেই নাকি স্বর্গের সিড়ি শুরু হয়েছে। এতটা উচ্চতায় প্রকৃতির রূপের বহিঃপ্রকাশ ছিল অভূতপূর্ব অসামান্য অবর্ণনীয়। একটা কথাই আছে "The best view comes after the hardest climb", আর এই কথাটা যে কতটা সত্যি সেটা এবারে বুঝতে পারলাম। সত্যি শরীর মন এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে গেল। ঠান্ডা হাওয়া ভালোবেসে জড়িয়ে ধরলো। পাগল হয়ে গেলাম প্রকৃতির রূপ দেখে। বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে কী করব? আনন্দে নাচবো, গলা ছেড়ে গান গাইব, এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়াবো নাকি চুপটি করে শান্ত ভদ্র মেয়ের মতো বসে থেকে প্রকৃতির লীলা খেলাকে উপভোগ করব। সার্থক হল নিজের বাড়ি ছেড়ে এত দূরে আসা, সার্থক হল এত কষ্ট সহ্য করে পর্বতারোহণ করা, সার্থক হল এই জীবন আর সার্থক হল এই মানব জনম। এরকম সূর্যোদয় দেখার জন্য আমি বারবার শতবার শত কষ্ট সহ্য করে হলেও পাহাড়ে আসতে রাজি আছি আর আসবোই।


Full team on the Summit Point, from left Vaibhav , Srish, Ashim, Veena, Shweta, Sriparna, Pragya

Team Leader Dhrubojyoti sitting in front

সেখানে আমরা সকলে অনেকক্ষণ ছিলাম। সেই শোভা ছেড়ে শুধু আমার কেন কারোরই হয়ত চলে আসতে ইচ্ছা করছিল না। তাই সেখান থেকে নেমে আসার কথা আমরা প্রায় ভুলেই গেলাম। কিন্তু ওই যে যার শুরু আছে তার শেষও তো আছে। তাই শেষ পর্যন্ত নেমে আসার জন্য প্রস্তুত হলাম। আর নেমে আসার আগে সবাই কেদারকন্ঠ মহাদেবের পায়ে পূজো আর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে নীচের দিকে নামা শুরু করলাম।

Ascending is much more easier than descending. চূঁড়া থেকে নেমে আসার সময় বারবার এই কথাটাই মনে হয়েছে। যে রাস্তা দিয়ে আমরা ওপরে উঠেছিলাম তার ঠিক বিপরীত দিক থেকে আমরা নীচে নামা শুরু করেছিলাম। তবে সেই রাস্তাটা যেদিক থেকে উঠেছিলাম তার থেকে একটু বেশিই খাড়া ভাবে নীচের দিকে নেমে গেছে বলে মনে হল। নামতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে এই বুঝি গড়িয়ে পড়লাম। অনেক বেশি সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিল। কারণ একবার যদি পা ফসকায় তাহলে তো দফা সারা। খাদে গিয়ে পড়ব না ঠিকই তবে বেশ অনেকটা নীচের দিকে গড়িয়ে পড়ব আর ভালো রকম আঘাত টা পাবো। এসব ভাবতে ভাবতেই এক পা এক পা করে নীচের দিকে নামতে থাকলাম।


আমরা সবাই একসাথে নীচের দিকে নামা শুরু করলেও আমরা কয়েকজন একটু পিছিয়ে পড়ি। নীচে নামার দিকে আমাদের মনোসংযোগ এতটাই ছিল যে আমাদের দলের বাকিরা কখন যে চোখের আড়ালে চলে গেছিল তা বুঝতেই পাড়ি নি। সামনের দিকে তাকিয়ে তাদের দেখা আমরা পাই নি। হতে পারে তারা অন্য পথ ধরেছিল নীচে যাওয়ার জন্য। যাই হোক আমরা মানে আমি, দি, দাদা, অসীম দা আর শ্রীস এবং সেই সঙ্গে Juda ka talab থেকে একটা ছোট্ট বন্ধু আমাদের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে এতদূর চলেছিল। একটি কুকুর যার নাম রাখা হয়েছিল শেরু, মানে আমরাই রেখে ছিলাম।

আমরা পাঁচ মূর্তি অত্যন্ত সন্তর্পণে নামতে থাকলাম। রাস্তাটির আশেপাশে কোনো গাছ ছিল না। আর সেটা পাথুরে রাস্তাও নয়। পুরোটাই open meadow. যত দূর চোখ যায় শুধু বিস্তির্ণ ঘাস জমি আর একদম শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছে ঘন পাইন গাছের সারি। আশপাশের দৃশ্যও অত্যন্ত মনোরম। চোখ জুড়িয়ে যায়। শুধু মনে হয় এখানে বসে দুচোখ ভরে প্রকৃতির রূপকে দেখি আর প্রাণ ভড়ে শ্বাস নি।

একসময় আমরা সবুজ ঘাস জমি ছেড়ে বরফের চাদরে মোড়ানো রাস্তায় এসে পৌছালাম। শিখরের দিকে যাওয়ার সময় আমরা বরফ পেয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু এতটা পুরু বরফের আস্তরণ জীবনে প্রথমবার দেখলাম। যত দূর চোখ যায় ততদূরই শুধু শ্বেত শুভ্র বরফ। প্রথমবার সমুদ্র দেখার আনন্দে একটি বাচ্চা মেয়ে যেমন সমুদ্রের জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে নেচে বেড়ায় তেমনি আমিও বরফের ওপর মচ মচ শব্দ তুলে আনন্দে হেটে বেড়াতে লাগলাম। কোনো কোনো জায়গায় চলতে চলতে বরফের মধ্যে পা টা হাটু অব্ধি ভুস করে ঢুকে যেতে লাগল। তারই মধ্যে দিয়ে আমি আর দি মহানন্দে এগিয়ে যেতে লাগলাম।


Walking on the meadows which was entirely snow covered

পাহাড়ে ওঠার সময় এবং নামার সময় কিছু দূর অন্তর অন্তর ছোট ছোট ধাবা মতো ছিল যেখানে ক্লান্ত পথিক দল কেউ আরাম করছে তো কেউ চা জলখাবার খাচ্ছে। এরকমই একটি ধাবা চূঁড়া থেকে নামার সময় আমরা দেখতে পেলাম, যার নামটা আমার বেশ ভালো লাগলো "maggie point"। যেহেতু আগেই বলেছিলাম আমাদের দলের কয়েকজন একটু আগেই নেমে আসে তো তাদের সাথে আমাদের সেই ধাবার কাছে আবার দেখা হয়ে গেল। সেখানে আমরা সকলে বিশ্রাম নিয়ে breakfast সেড়ে নিলাম।

বেলা যত বাড়তে লাগল সূর্যদেব ও ততই সদর্পে তার আলোর তেজ বাড়াতে লাগলেন। আর তার ফলে ওই হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে অনেক টাই আরাম বোধ করলাম সকলেই। Maggie point এ আমরা বসে সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে বেশ অনেকখানি সময় কাটিয়ে দিলাম। কারোর মুখেই আর কথা সরছে না কারণ প্রকৃতি যে প্রতি পদে পদে আমাদের বাকরুদ্ধ করে গেছে, নিজের লীলা দেখিয়ে মুগ্ধ করে গেছে। আর আমরাও তাতে এতই মোহিত হয়ে গেলাম যে সময়ের আর কোনো হিসেব থাকলো না। বেশ অনেকটা সময় এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর সবারই হুশ ফিরল যে এবারে আমাদের নীচের দিকে অগ্রসর হতে হবে আর দেরি করা যাবে না।

বেলা 2টো নাগাদ আমরা base camp এ এসে পৌছালাম। ক্লান্ত শরীরে রোদের তাপ গায়ে মেখে দুপুরের খাওয়ার সেরে আমরা তৈরি হয়ে নিলাম নীচে Juda ka talab এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য। এখান থেকেই যেন আমাদের এই যাত্রাটা একটু অন্য রকম হয়ে গেল। এখান থেকেই এই adventure এর শেষের শুরু হল।

আমরা আন্দাজ 3টে নাগাদ নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। একটা মন কেমনের রেশ সেখান থেকেই শুরু হল। আমরা সবাই তাই চুপচাপ হাটতে লাগলাম নীচের দিকে যেখান থেকে দুদিন আগেই এক নতুন অভিজ্ঞতার সূত্রপাত হয়েছিল। তখন থেকেই মনে হতে লাগল যে ব্যস আর মাত্র একটা দিন, তারপরেই আবার সেই গতানুগতিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে হবে। আমার মতো হয়তো বাকিদের মনেও সেই একই চিন্তা চলছিল। হয়তো কেন বলছি, আমি হলফ করে বলতে পারি সবারই একই অবস্থা ছিল।

আমরা Juda ka talab এর থেকে একটু ওপরে একটি ছোট ধাবার কাছে যখন এসে পৌছালাম তখন সূর্যদেব অস্তাচলে গেছেন। অন্ধকার হব হব করছে। সেখানে আমরা বসে ভীনা জি আর দাদার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। নামার সময় ভীনা জি পায়ে চোট পাওয়ার কারণে আমাদের থেকে তুলনামূলকভাবে ধীরে হাটছিলেন। কিন্তু সেই ব্যাথাও মানুষটির ইচ্ছাশক্তি ও অদম্য জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। কোনো প্রতিকূলতাই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারে নি।

ওরা দুজন আসার পর আমরা আবার পথ চলতে শুরু করলাম। সন্ধ্যা 7:30টা কি 8টা নাগাদ আমরা Juda ka talab এ এসে পৌছালাম। সেখানে পৌছে দেখলাম অন্য আরেকটি দল সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল, যারা নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ করতে এসেছে। সেই জায়গাটা তখন তাদের আনন্দ উল্লাসে গমগম করছে। কিন্তু তখন আমরা প্রত্যেকেই বড্ড ক্লান্ত ছিলাম। তাই খুব একটা দেরি না করে রাতের খাবার খেয়ে যে যার tent এ গিয়ে শুয়ে পড়লাম আর অদ্ভুত ভাবেই শোয়া মাত্রই ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলাম।

10th December সকাল 8:30টা নাগাদ ঘুম ভাঙলো। আর সাথে সাথেই মনটা ভীষণ রকম ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। tent এর বাইরে বেড়িয়ে এলাম। অন্য দিন সকালে tent এর বাইরে বেড়োলে ঠান্ডায় কাপুনি ধরে যেত। কিন্তু সেদিনের সকালটাও ছিল ভীষণ রকম শান্ত স্নিগ্ধ। একটা ঠান্ডা মিঠেল বাতাস আমাকে ছুঁয়ে মনটা আরো উদাস করে দিল। 8th December যখন এই জায়গাটা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম তখন মনে ছিল এক অফুরন্ত উচ্ছাস, নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের উত্তেজনা, ছিল এক উন্মাদনা। তখন মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও যেন আমাদের সেই আনন্দ উচ্ছাসে নিজেকে সামিল করে নিয়েছে। আমাদের উন্মাদনা দেখে সেও একই সাথে নেচে উঠেছে। কিন্তু এখন যেন মনে হচ্ছে এই পাহাড় জঙ্গল নতুন কিছু সঙ্গীকে পেলেও পুরোনো সঙ্গীদের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসায় সেও মর্মাহত। তাই সেও ভীষণরকম শান্ত।

সময় যত ঘনিয়ে আসতে লাগল মনটাও তত নিদারুণ কষ্টে ভারাক্রান্ত হতে লাগলো। যে অদ্ভুত ভালো লাগার চাদরে এই কয়েক দিন নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছিলাম, যে পরীর রাজ্যে এতদিন ডানা মেলে উড়ে বেড়িয়ে ছিলাম, সেই স্বপ্ন রাজ্য থেকে যেন কঠিন বাস্তবের জগতে ফিরে আসার জন্য কেউ হাত ধরে টানতে লাগলো। গত কয়েক দিনে জীবনের যত না পাওয়ার দুঃখ ছিল, যা কিছু হারানোর কষ্ট ছিল সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছিল। কোনো রকম চিন্তার লেশমাত্র ছিল না। মনে হচ্ছিল এইতো সব পেয়েছি। এর থেকে বেশি কিছু আর চাই না। যে ভালোবাসা প্রকৃতি আমাকে উজাড় করে দিয়েছে তারপর আর কোনো অর্থ বৈভবের দরকার নেই। পাহাড় সত্যিই কাউকে ফিরিয়ে দেয় না, উল্টে সবটুকু উজাড় করে আপন করে নেয় আর সেই ভালোবাসা যে দুহাত ভরে নিতে পারে তার থেকে ভাগ্যবান আর কেউ নয়। আমি কতটা ভাগ্যবান জানিনা তবে সেই ভালোবাসাকে আমি প্রতি পরতে পরতে অনুভব করেছি। যে ঠান্ডা হিমেল হাওয়া প্রতি মূহুর্তে পরম মমতায় আদর করে চুম্বন এঁকে দিয়ে যাচ্ছিল তা আমি রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমি যে সত্যিকারের পাহাড়ের প্রেমে পড়েছি। প্রকৃত অর্থেই পাহাড়কে মন দিয়ে বসেছি। আর ঠিক সেই কারণেই পাহাড় ও প্রকৃতির সেই অপার সৌন্দর্যকে ফেলে চলে আসতে কিছুতেই মন চাইছিলো না। ভীষণ ইচ্ছা করছিল সেখানেই থেকে যাই আজীবন।

সেই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সকলের থেকে বেশ কিছুটা তফাতে গিয়ে একা একা বসে রইলাম। সামনের পাইন গাছের জঙ্গলের ফাকা অংশ দিয়ে দূরের বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যে কখন নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলেছিলাম বুঝতে পারিনি। মনে হচ্ছিল আমার সব কিছু যেন এখানে রেখে চলে যাচ্ছি, যেন নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছি। ভয় করতে লাগল এই ভেবে যে যদি আর কখনও ফিরে আসতে না পারি তাহলে কি হবে? এই ভালোবাসা ছেড়ে থাকা তো সম্ভব নয়। ভীষনরকম কষ্ট হচ্ছিল।

এসবই যখন ভাবছি আর কেঁদে চলেছি ঠিক তখনই একটা আওয়াজে আমার ভাবনার জালটা ছিড়ে গেল। শুনতে পেলাম ধ্রুব দা বলছে "আরে কাঁদছো কেন? কেঁদো না। আবার তো আসবে। এভাবে যাওয়ার দিন কাঁদলে সবার মন খারাপ হয়ে যাবে।" আমার মধ্যে তখন ঠিক কী চলছিল সেটা হয়তো ধ্রুব দা বুঝতে পেরেছিল। আমাকে ওইভাবে একা একা বসে কাঁদতে দেখে দি ও ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছিল। আদর করে দিয়ে বলেছিল "এখন না গেলে পরেরবার আবার আসবে কেমন করে?"। কথাটা সত্যি কিন্তু তাও মন মানতে চাইছিল না কিছুতেই।

একসময় মনে হল যে নাহ্ এবার যদি সত্যি ফিরে না যাই তাহলে পরেরবার আবার নতুন উদ্যম নিয়ে ফিরে আসবো কীভাবে? আসতে তো হবেই আবার। নতুন উদ্যমে, নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে, নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে এবং সর্বোপরি নতুন জায়গার অন্বেষণ করতে। এই হাতছানি কে উপেক্ষা করার ক্ষমতা তো আমার নেই আর উপেক্ষা করতেও চাই না। যারা পাহাড়কে ভালোবাসে তারা একটা টান সব সময়েই অনুভব করে। আর আমি সেই টানটা অনুভব করতে পারছি। চোখের জল মুছে উঠে পড়লাম। আর মনকে ভারাক্রান্ত হতে না দিয়ে এই কয়েকদিনের মধুর স্মৃতি, নির্ভেজাল আনন্দ, আর এক অপার ভালোলাগা কে সঙ্গী করে তৈরি হয়ে নিলাম।


Last Day at juda Ka talab Campsite

বেলা 9টা নাগাদ breakfast করে নিজেদের স্যাক গুছিয়ে আমরা আমাদের এই adventure এর শেষ গন্তব্যস্থল Sankri এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এই Sankri থেকেই তো 7th December নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে পাড়ি দিয়েছিলাম। আর এখন সেই Sankri এর পথেই এগিয়ে যাচ্ছি চোখে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে। একটাই স্বপ্ন দেখেছিলাম শুধু একটাই। পাহাড়, ট্রেকিং, অ্যাডভেঞ্চার। সেই একটা স্বপ্ন পূরণ হওয়ার সাথে সাথে আমি আরো অনেক স্বপ্ন দেখে ফেলেছি। হাজারো স্বপ্ন। এই তো সবে শুরু হল নিজের স্বপ্নের হাত ধরে পথ চলা। এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে। অনেক পাহাড়ে ওঠা বাকি আছে, অনেক সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা বাকি আছে, নতুন নতুন জায়গায় নতুন নতুন অ্যাডভেঞ্চার করা বাকি আছে। অনেক নতুন জায়গা অন্বেষণ করা বাকি আছে। এই বছর নিজের জন্মদিনের দিন ভগবানের কাছে একটা অদ্ভুত প্রার্থনা করেছিলাম, পরেরবার জন্মদিন টা যেন আর না আসে কিন্তু এখন যে আমি অনেক বছর বাঁচতে চাই নিজের স্বপ্ন গুলোকে পূরণ করার জন্য।

Sankri এর দিকে সেই একই জঙ্গল আর একই বোল্ডারে ভর্তি রাস্তা দিয়ে আমার এগোতে থাকলাম। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার প্রত্যেকবারই মনে হতে লাগল ওপরে ওঠার সময়ে তো এই রাস্তা দিয়ে আসি নি। কেমন অচেনা অচেনা ঠেকছে। অথচ বাকিদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এই একই রাস্তা ধরেই ওপরে উঠেছিলাম। তাহলে হয়তো এই পাহাড়ও চাইছে আমি নিজের মন খারাপ ভুলে গিয়ে পুরোনো রাস্তাকেই নতুন ভাবে চিনতে চিনতে যাই। একটা ভালো লাগার রেশ চিরদিন থেকে যাক। ভালো মূহুর্ত, পাহাড়ি নির্ভেজাল আনন্দ গুলো মন ভালো করার দায়িত্ব নিক।

খুব সম্ভবত 1টা নাগাদ Sankri তে এসে পৌছালাম। সেখানে আমরা সকলে কিছু সময় বিশ্রাম করে, তারপর lunch সেড়ে আবারও তৈরি হয়ে নিলাম কারণ তখন নীচে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে। আমরা এক এক করে নিজেদের স্যাক গুলো গাড়িতে তুলে নিজেরাও উঠে বসলাম। 2টো নাগাদ গাড়ি রওনা হল তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে Dehradun এর পথে। পাহাড়ি পথে এঁকে বেঁকে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে পিছনে ফেলে, পাহাড়ি নিস্তব্ধতার গন্ডি ছেড়ে, পাহাড়ি সাম্রাজ্য থেকে বেড়িয়ে ধীরে ধীরে কংক্রিটের জগতে পাড়ি দিতে লাগলাম। প্রতি মূহুর্তে মনে হচ্ছিল কিছু একটা নেই কিছু একটা যেন হাড়িয়ে গেল যা কিছুক্ষণ আগেও ছিল তা এখন আর নেই।

শেষ মুহুর্তেও প্রকৃতি তার রূপের ঝলক থেকে আমাদের বঞ্চিত করে নি। সন্ধ্যা যখন দরজায় করাঘাত করল তখন দেখলাম দূরের পাহাড়ের আড়াল থেকে চন্দ্রদেব ধীরে ধীরে বেড়িয়ে আসছেন আমাদের শেষবারের মত বিদায় জানাতে। অন্ধকারে ডুবে যাওয়া পাহাড়ের গায়ে ছোটো ছোটো আলোক বিন্দু গুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল জোনাকির দল উড়ে বেড়াচ্ছে। শেষবারের মত আবারও মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম সেই দিকে। মন খারাপের পাশাপাশি এক মন ভালো করার স্বাদ পেলাম।

রাত 9:30টা নাগাদ গাড়ি আমাদের Dehradun স্টেশনে নামিয়ে দিল। স্টেশনে পৌছবার কিছু আগেই শ্বেতা জী নেমে গেলেন। আর স্টেশনে গাড়ি আমাদের পৌঁছে দিয়ে ভীনা জী কে তার হোটেলের উদ্দেশ্যে নিয়ে চলে গেল। রয়ে গেলাম শুধু আমি, প্রজ্ঞা দি, ধ্রুব দা, অসীম দা, শ্রীস আর বৈভব দা। অসীম দার ট্রেনের সময় হয়ে আসছিল বলে তিনিও শেষ পর্যন্ত আমাদের বিদায় জানালেন।

আমরা বাকি পঞ্চ পান্ডব রাতের খাবার খেয়ে যখন স্টেশনে এসে পৌছালাম তখন আমাদের ট্রেন ছাড়তে আর 5 মিনিট বাকি ছিল। কাটায় কাটায় 10:45 এ ট্রেন Dehradun স্টেশন ছেড়ে Nizamuddin এর দিকে এগিয়ে চলল। জানলার পাশে সিট থাকায় সারা রাত প্রায় জেগে বাইরের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিলাম।

11th December ভোর 4:30 টের সময় ট্রেন Nizamuddin এ এসে থামল। সেখান থেকে বৈভব দা আমাদের বিদায় জানিয়ে নিজের গন্তব্যের দিকে চলে গেল। আর আমরা চারজন সেখান থেকে গাড়ি ধরে চলে গেলাম Delhi স্টেশনে। সেখানে পৌঁছে মনটা আরও খারাপ করে দিয়ে দি চলে গেল বাড়ির পথে। আর আমি তার চলে যাওয়ার পথের দিকে বোকার মতো চেয়ে রইলাম। পাহাড়ের সাথে সাথে এই মানুষটা কেও তো ভালোবেসে ফেলেছি।

থেকে গেলাম আমরা তিন মূর্তি। ভাবতেই ভীষণ অবাক লাগছিল যে একটা 8 জনের দল কীভাবে কমতে কমতে 3 জনে এসে থামল। এও জানি এক সময় আমরা এই তিন জনও এক এক করে আলাদা হয়ে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাবো। শুধু যেটা জানা নেই সেটা হল আবার কবে আমাদের দেখা হবে, আবার কবে আমরা একসাথে হই হই করে নতুন পথে পাড়ি জমাব। হয়তো এরপর আরও নতুন নতুন মানুষের সাথে আমার আলাপ হবে আবার নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চারে কিন্তু এই মানুষ গুলোকে কখনো ভুলতে পারবো না। আমার মনের কোনে কেদারকন্ঠ, এই অ্যাডভেঞ্চার আর এই মানুষ গুলো একটা আলাদা জায়গা করে নিল।

Delhi স্টেশনের waiting room এ গিয়ে নিজেদের স্যাক রেখে হাত মুখ ধুয়ে breakfast সেড়ে যে যার মতো যেখানে পারলাম শুয়ে পড়লাম। আর সাথে সাথেই এই কয়েক দিনের ক্লান্তির কারনেই চোখ ঘুমে বুজে এল। বেলা 12টা নাগাদ waiting room থেকে বেড়িয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম Delhi শহর টাকে একটু ঘুরে দেখার জন্য। যেহেতু আমাদের ট্রেনের তখনও বেশ কিছু সময় দেরি ছিল তাই আমরা জামা মসজিদে গিয়ে সময় কাটিয়ে, lunch সেড়ে ফিরে এলাম স্টেশনে। 4:30 টের সময় শিয়ালদহ-রাজধানী তে উঠে পড়লাম বাড়ির উদ্দেশ্যে।

12th December বেলা 11টা নাগাদ অবশেষে শিয়ালদায় পৌছে গেলাম। সেখান থেকেই আবার আমাদের তিন জনের আলাদা হওয়ার পালা।

ফিরে এলাম নিজের শহরে। নিজের জায়গায় নিজের বাড়িতে। এত দিন পর বাড়ি ফিরে স্বাভাবিক ভাবেই যে আনন্দটা হওয়ার কথা ছিল সেই আনন্দটা কিন্তু ঠিক হচ্ছিল না। খালি মনে হতে লাগল কিছু একটা নেই। এমন কিছু যেটা হারিয়ে গেছে। যেটা কিনা আমার সাথে ফিরে আসা উচিত ছিল অথচ ফিরে আসে নি। কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না সেটা কী? বাড়ি ফেরার এত গুলো দিন পরেও যখন শয়নে স্বপনে শুধুই সেই পাহাড় আর পাহাড়ে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তকে চোখের সামনে ভেসে উঠতে দেখলাম তখন বুঝলাম যে আমি তো নিজেকেই সেখানে রেখে এসেছি। নিজেকেই আমি হারিয়ে ফেলেছি ওই নীল আকাশের নীচে পাহাড়ের কোলে প্রকৃতির মাঝে। শুধু আমার শরীর টাই বাড়ি ফিরেছে।

বাড়িতে তো সবই আছে। এই শীতের দিনে কম্বল মুড়ি দিয়ে আরামের ঘুম আছে, কব্জি ডুবিয়ে তৃপ্তি করে খাওয়ার মতো মায়ের হাতের রান্না আছে। চিত্তবিনোদনের সমস্ত উপকরণ আছে। চাকচিক্যময় জগতের মিথ্যে প্রতিশ্রুতিরা আছে। ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়ি দের ছুটে চলা আছে। অনেক কিছুই আছে। কিন্তু সেই অনেক কিছু আছের মধ্যেও যে অনেক কিছু নেই। সেখানে গিয়ে যে অদ্ভুত রকমের মানসিক শান্তি পেয়েছিলাম সেটা নেই, পাহাড়ি নিস্তব্ধতা নেই, প্রকৃতির লীলা খেলা নেই, মনোরম দৃশ্য নেই। Dinner tent এ বসে একসাথে হই হই করে রাজমা চাওয়াল খাওয়ার সুখ নেই, সকালের হিম শীতল ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে দাড়িয়ে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া নেই। নেই সেই সূর্যাস্ত যা দেখে চক্ষু সার্থক হয়েছিল, নেই সেই সূর্যোদয় যার জন্য শত কষ্ট সহ্য করেও বারবার পাহাড়ে ফিরে যেতে রাজি হওয়া। হিসেব করে দেখতে গেলে সেই "নেই" এর তালিকাটি অনেক বড়ো হয়ে যাবে। শহরের জীবনে এ যেন এক রূপকথার কাহিনী। যারা উপলব্ধি করেছে তারা বাদে বাকিদের কাছে এ এক শুধুই গল্প ব্যতীত অন্য কিছু নয়।

একটা মাত্র স্বপ্নের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সেই দূর দেবভূমি উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার ছোট্ট গ্রাম শাঁকরি তে যাওয়া আর সেখান থেকে 12500 ফুট উচ্চতায় নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার মধ্যে জীবনের সার্থকতাকে খুঁজে পেয়েছিলাম। খুঁজে পেয়েছিলাম নিজেকে। নিজেকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছিলাম, নিজের ক্ষমতার সাথে সেই দিন পরিচয় হয়েছিল। আর তারই সাথে আরো হাজারো স্বপ্ন চোখে নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। সেই সব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। সময় যে বেশি নেই। আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছিল দাদা তোমার জন্য। পাহাড়ে তো আমাকে ফিরতেই হবে সেই হাজারো স্বপ্ন কে পূরণ করতে। তাকে ছেড়ে থাকা যে ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে উঠছে। তার আশীর্বাদের তার ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও ছাড়তে রাজি নই আমি। যাবো আবারো আর তার জন্য এখন থেকেই আবার নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করে দিয়েছি। আমি আসছি হে পর্বতরাজ হিমালয়, তোমার রাজ্যের অধিবাসী হতে। আমি আসছি।

----- সমাপ্ত -----


Special Thanks to Srish Banik and Pragya Mukherjee for contributing their amazing clicks.





324 views0 comments

Recent Posts

See All
bottom of page