top of page

চিন্তাফু-র উদ্দেশ্যে


হাই অদ্রি, 


কি খবর তোমার? 


ভীষণ রেগে আছো না! না বলে দুম করে চলে গিয়েছিলাম বলে?


কি করবো বলো? এতো কম সময়ের ব্যবধানে যাওয়া ঠিক হয়েছিল যে চিঠি লেখার একদম সময় পাইনি। আর তোমার সাথে তো ফোনে যোগাযোগ করাও সম্ভব নয়, তাই জানানোর কোন সুযোগ হয়নি। 


সাথে মাথায় ছোট্ট একটা দুষ্টু বুদ্ধিও খেলা করেছিল যদিও, হঠাৎ গিয়ে তোমাকে চমকে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারিনি। 


প্রথম যেদিন দেখা হল, তোমার সেই রুদ্ররূপ আমি মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম জানো, কি যে ভীষণ রেগে গেছ, সেটা তখনই বুঝেছি। 


খুব তো ফন্দী এঁটেছিলে বলো, একটাও ছবি তুলতে দেবেনা ভেবেছিলে, কিন্তু পারলে না তো আমাকে দমিয়ে রাখতে। খুব্বব্ব মজা হয়েছিল তখন তোমার রাগি মুখটা দেখে। 


যাই হোক, তোমাকে তো তখন সব কথা বলা হয়নি, এবার পুরো গল্পটা শোন, তাহলেই বুঝতে পারবে যে আমার পক্ষে তোমাকে জানানো কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। 


আগের বছরের শেষের দিকে তোমাকে দেখার জন্য মনটা খুব ছটফট করছিল জানো। সেই কবে দেখা হয়েছিল নেপালে তাও সেই বৃষ্টি ভেজা বিকেলে অল্প কিছুক্ষণের জন্য। তারপর আগস্টে কাশ্মীরে গিয়ে তো তোমার বাড়ি, বাগান, ঝিল দেখেই ফিরে এলাম, তুমি তো দেখাই করলে না। মনটা ভীষণ খারাপ লাগছিল, খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল, কেমন একটা অস্থির অস্থির লাগছিল। তাই আর কাল বিলম্ব না করে দিন দশেকের ব্যবধানে নতুন বছরে যাওয়া ঠিক করে ফেললাম। 


এবার আবার সেই নেপাল, যেখানে গিয়ে ভীষণ ভীষণ অভিমান নিয়ে ফিরেছিলাম, আর কোনদিনও চিঠি লিখবো না বলেছিলাম। কিন্তু সব রাগ, অভিমান তুমি এবার ভুলিয়ে দিয়েছ। না বলে যাওয়ার জন্য রাগ করেছ ঠিকই সাথে সাথে সময় ও দিয়েছ। তাই আবার চিঠি লিখতে বসলাম, সব ঘটনা তোমাকে তো জানাতেই হবে, নয়ত আমার যে শান্তি হচ্ছে না। 


এখানে অনেক নতুন নতুন ঘটনা আছে জানো, প্রথমবার একা বেরোনোর প্ল্যান করেছিলাম, তাও বাড়িতে কিচ্ছু না জানিয়ে। 


সব ঘটনাই তোমাকে বলছি একে একে, বেশি রাগ না করে মন দিয়ে পড়ো কিন্তু। 


তো গেল বছরের শেষে যখন তোমাকে দেখার জন্য মন আঁকুপাঁকু করছে তখন কথা হল ‘himalayan passion’-এর কর্ণধার ধ্রুবজ্যোতির সাথে। ধ্রুব আহ্বান জানালো নেপালের এক স্বল্প পরিচিত ট্রেক – চিন্তাফুর উদ্দেশ্যে।


একটু গুগুল করে দেখে জায়গাটা বেশ ভালোই লাগলো তো সমস্ত চিন্তাকে ‘ফুঁ’ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ‘চিন্তাফু’-র উদ্দেশ্যে। 


ভাবছ তো কিসের এতো চিন্তা আর কেনই বা এতো চিন্তা!!


মাথার মধ্যে অজস্র চিন্তা – ‘ট্রেনে একা কখনো যাইনি, একা অসুবিধে হবে না তো? 


ট্রেনের পর চিন্তা এলো গ্রুপ নিয়ে, যাদের সাথে যাওয়ার প্ল্যান করেছি, তাদের সাথে এটাই প্রথম ট্রেক, ‘কেমন হবে কে জানে’। 


দেখতে দেখতে যাওয়ার দিনটি এসে গেল, এবার সমস্ত চিন্তাকে উড়িয়ে দিয়ে ‘দুগগা দুগগা’ করে বেরিয়ে পড়লাম মনে মনে একটা কথাই বললাম “যা হবে দেখা যাবে”, ভালো হলে এরপর আর কারুকে দরকার হবেনা সাথে যাওয়ার জন্য আর খারাপ হলে কোনোদিন আর একা বেরনো হবেনা। 


দেখা যাক কি হয়।


আমার ট্রেন ছিল শিয়ালদা থেকে পদাতিক এক্সপ্রেস, নির্দিষ্ট সময়ের বহু আগে শিয়ালদা পৌঁছে গিয়েছিলাম। একা একা বসে যখন ভীষণ বিরক্ত বোধ করছি তখন টিম লিডার অরিন্দমকে ফোন করে জানলাম তিনিও পৌঁছে গেছেন। তাই আর একা বসে না থেকে অরিন্দমের সাথে পরিচয় পর্বটা সেরে নিলাম। পাহাড় প্রেমী মানুষদের এই এক মুশকিল (ভীষণ ভালো দিক) আলাপের শুরুই হয় পাহাড়ের গল্প দিয়ে, আর কথা বলতে বলতে কখন যে সময় কেটে যায় বোঝাই যায় না। 


ইতিমধ্যে পদাতিক এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে ঢুকে গেছে আর আমরাও নিজেদের বগির দিকে হাঁটা দিলাম। আমি সাধারণত এক রাতের ট্রেন জার্নি থাকলে স্লিপারেই টিকিট কাটি, বন্ধুরা মিলে হই হই করে কেটে যায়। এবারে প্রথমবার ফার্স্ট ক্লাসে টিকিট কেটেছি, এখানেও বিশাল চিন্তা ‘কিরকম কুপ হবে, সাথে আবার কাকে দেবে’ এই সব আর কি। 


এখানেও আমাকে নিরাশ হতে হয়নি, আলাপ হয়েছিলো এক পাহাড় প্রেমি বন্ধু অঙ্কিতা কুণ্ডু – র সাথে। ওর বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগণায় হলেও কর্মসূত্রে প্রায়শই উত্তরবঙ্গে যেতে হয়, সেই সাথে উত্তরবঙ্গের অলিগলি পাহাড় জঙ্গল সমস্তটাই ঘুরে আসে। প্রচুর প্রচুর গল্প হল ওর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে। রাতের ঘণ্টা চারেক ঘুমনো বাদে আমরা বাকি সময় গল্প করেই কাটালাম। এমনকি এন যে পি আসতেও আমার নামার কথা মনেই ছিল না, এত গল্পে মশগুল ছিলাম। 


অঙ্কিতাকে টাটা করে, আবার দেখা হবে অঙ্গিকার করে এন যে পি নামলাম। টিম লিডার অরিন্দমের সাথে স্টেশনের বাইরে এসে এবার দেখা হল গ্রুপের আর এক সদস্যা মৌমিতার সাথে। তিনজনে একসাথে এগিয়ে গেলাম খাবারের দোকান গুলোর দিকে, ওখানে একটি দোকানে দেখা হল ধ্রুবজ্যোতি আর সৌরভের সাথে। দুজনের সাথেই আগে ফোনে কথা হয়েছে, এই প্রথম দেখা সাক্ষাৎ হল। ওখানে বেশ কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে তারপর প্রাতরাশ সেরে সৌরভের গাড়িতে যাত্রা শুরু করলাম। আলাপচারিতায় জানতে পারলাম সৌরভ পেশায় চিকিৎসক আর পাহাড়কে ভালোবেসে দক্ষিণবঙ্গের ঘর বাড়ি ছেড়ে সুদূর উত্তরবঙ্গের হাসপাতালে বদলি নিয়েছে যাতে পাহাড়ের কোলে থাকা যায়। কি ভয়ানক এই টান ভাবতে পারো?


পশুপতি ফটক অবধি সৌরভের গাড়িতে আসার পর সীমান্ত দ্বার পেরিয়ে অন্য একটি গাড়ি ধরে যাত্রা শুরু দেওরালির উদ্দেশ্যে। চিরাচরিত পাহাড়ি পথ, বিস্তারিত বর্ণনায় আর গেলাম না, মাঝে একবার দুপুরের খাবারের বিরতি দিয়ে সন্ধ্যের মুখে দেওরালি পৌঁছলাম। 


পাহাড়ের কোলে গুটিকয়েক ছোট বড় বাড়ি নিয়ে তৈরি এক গ্রাম এই দেওরালি। সামনে দিয়ে এক রাস্তা চলে গেছে, রাতের বেলায় আলো জ্বালিয়ে রাস্তা তৈরির কাজ চলছিল। যতক্ষণ দিনের আলো ছিল, তাও একটা- দুটো গাড়ি ওপরের দিকে যাচ্ছিলো, অন্ধকার নামতে চারিদিক পুরো শুনশান হয়ে গেল।


আমার আবার কোন নতুন জায়গায় গেলে রাতের দিকে একটু বেরোতে ইচ্ছে করে, সেই ইচ্ছে চাগাড় দিতে একটু বেরলাম, কিন্তু কিছুদুর যাওয়ার পর এতো অন্ধকার যে আর এগোনোর সাহস হল না, হোটেলেই ফিরে এলাম। রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে এবার ঘুমের পালা। এখানে একটা ব্যাপার আমাকে মুগ্ধ করে নেপালের খাবার পরিবেশনের সাথে আতিথেয়তা, ভীষণ আন্তরিকতার সাথে খাবার পরিবেশন করলেন গৃহকর্তি।


রাতে হোটেলের পাশের এক চালাঘর থেকে এক মোরগ প্রতি প্রহরে ডেকে ডেকে সময়ের জানান দিচ্ছিল। সেই অ্যালার্মে খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল, তখনও বাইরে আলো ফোটেনি। এই সময়টা আমার ভীষণ প্রিয়। বারান্দায় গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। রাতের তারা গুলি এক এক করে হারিয়ে যেতে লাগলো আর পূব দিগন্তে রাঙা আবির ছড়িয়ে সুজ্যি মামা উদয় হলেন।  


এবার আমরা প্রাতরাশ সেরে যাত্রা শুরুর জন্য তৈরি হয়ে আমাদের নতুন গাইড ভাই এর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম, কারণ আগের রাতে বাড়িতে কিছু অঘটন ঘটায় নিমা-জি বাড়ি চলে গেছেন, এদিন থেকে এক নতুন গাইড থাকবে। 




বেশ কিছুক্ষন এদিক ওদিক ঘুরে সময় কাটানোর পর আমাদের নতুন গাইড সন্দেশ ভাই এসে হাজির, একদম স্বার্থকনামা যাকে বলে, সন্দেশের মতনই মিষ্টি এক ছোট্ট নেপালি ছেলে আমাদের সন্দেশ ভাই, মুখে সারাক্ষন এক হাসির প্রলেপ। 


দেওরালি থেকে মাই-মাজুয়াঃ


এবার আর কালবিলম্ব না করে আমরা রওনা দিলাম পরবর্তী গন্তব্য মাই-মাজুয়ার দিকে। এদিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘তোড়কে ঝর্ণা’ (todke fall) যার নাম আমি বার বার ভুল করে ‘তড়কা তড়কা’ করছিলাম। নেপালের দ্বিতীয় উচ্চতম ঝর্ণা এটি, তো স্বাভাবিক ভাবেই দেখার জন্য মন উস্খুস করতে লাগলো।




শুরুর দিকে ভাঙ্গাচোরা গাড়ি চলার রাস্তা দিয়ে ভীষণ বিরক্তির সাথে হেঁটে চললাম। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজ চলছে, শুকনো ধূলি ধূসরিত পথ, একটা গাড়ি গেলে পুরো ধুলোয় স্নান করিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ভীষণ ভীষণ বিরক্ত লাগছিলো, সাথে অল্প অল্প ভয়, “সন্দেশ ভাই রাস্তা চেনে তো!! তোড়কে ঝর্ণা দেখতে পাবো তো!! টপকে বেরিয়ে না যায়।“ 


এই অদ্ভুত আশঙ্কা মনের মধ্যে বেশিক্ষণ চেপে রাখতে না পেরে বার দুয়েক আমাদের লিডার অরিন্দমকে জিজ্ঞেস ও করে ফেললাম। অরিন্দমের অভয়বাণী শুনে মনে একটু আশার সঞ্চার হল আর তারপরেই রাস্তার ডানপাশে তীর চিহ্ন দিয়ে দিক নির্দেশ চোখে পড়লো। ভাঙ্গাচোরা গাড়ি চলার রাস্তা ছেড়ে নিচের দিকে গ্রামের মধ্যে দিয়ে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে তোড়কে ঝর্ণার দিকে। 






এবার আমি ভীষণ খুশি, ওই অসহনীয় ধুলো ভরা রাস্তা থেকে অবশেষে মুক্তি পেলাম। 


এখানের পথ আর পরিবেশ দুটোই ভীষণ সুন্দর। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দুপাশে ধাপ চাষ হয়েছে, ঘূর্ণায়মান নলের সাহায্যে চক্রাকারে জমিতে জল দেওয়া চলছে, এক জমিতে এক বৃদ্ধাকে মাটি কোপাতে দেখলাম, কোন জমিকে আবার হলুদ রঙে রঙিন করে সর্ষে ফুল ফুটে আছে। সব ভীষণ সুন্দর আর পরিপাটি করে সাজানো। কিছুদূর নামার পর গাছপালায় ঘেরা এক সমাধি ক্ষেত্র পড়লো, আমরা ওখানে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে আবার নামতে থাকলাম। 


এবারে সিঁড়ি শেষ হয়ে ঢালু জঙ্গলে ঘেরা পথে চলতে লাগলাম, আর ক্ষীণ এক জলের কুলুকুলু ধ্বনি শুনতে পেয়ে মন আনন্দে নেচে উঠলো, ‘জল যখন এসে গেছে ঝর্ণাও খুব তাড়াতাড়ি দেখা দেবে’।  জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে শুকনো পাতা মারিয়ে এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুদুর যাওয়ার পর আবার ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে আর সিঁড়ির শেষে দেখা মিললো আমাদের এদিনের প্রধান আকর্ষণ তোড়কে ঝর্ণার।

 

অনেক উঁচু থেকে জলের ধারা নিচে পাথরের ওপর পড়ে বিন্দু বিন্দু জলকণায় পরিণত হয়েছে, বেশি কাছে এগোতে গেলেই পুরো ভিজিয়ে দিচ্ছে। নিচে এক ছোট জলাশয় তৈরি হয়েছে, তারপর সেই জলধারা আবার ঢালু পথ বেয়ে নিচের দিকে বয়ে চলেছে। 





অরিন্দম একদিকে ছোট্ট ওভেন (বিউটেন), ছোট্ট গ্যাস সিলিন্ডার (বডি স্প্রে বোতলের মতন দেখতে)-এর সাহায়্যে ম্যাগি বানাতে বসলো। এটা আমার আর এক নতুন অভিজ্ঞতা, এর আগে বিউটেনের ব্যবহার দেখিনি কখনো। বেশ একটা পিকনিক ভাব লাগছিলো। বাসন গুলো ঝর্ণার জলে ধুয়ে রান্না বসানো হল, আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চারজনের মতন ম্যাগি তৈরি হয়ে গেলো, পুরো ম্যাজিকের মতন ব্যাপার।

 

ঝর্ণার ধারে বসে গুঁড়ি গুঁড়ি জলের ছিটে গায়ে মেখে ম্যাগি খাওয়া, উফফ যেন স্বর্গ। ম্যাগি তো পাহাড়ে গেলেই খেতে হয়, প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও ইদানিং কালে আর ভালো লাগেনা, আমি তো সমতলে ম্যাগি খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছি, এতো বাজে লাগে। কিন্তু এই বিরক্তিকর খাবারটা যে এবার এতো সুন্দর এক অভিজ্ঞতা দিলো সেটা চিরকাল মনে থাকবে। 


খাওয়া-দাওয়ার পাট মিটিয়ে তল্পিতল্পা গুছিয়ে বেশ কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দি করে আবার হাঁটা শুরু। কিছুদুর সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামার পর একটা সাঁকো পেরিয়ে গাড়ি চলার রাস্তা পড়লো। নামেই গাড়ি চলার রাস্তা, ওখান দিয়ে গাড়ি করে যেতে গেলে শরীরের হাড়মাস আলাদা হয়ে যাবে ঝাঁকুনির ঠেলায়। গ্রামের মধ্যে দিয়ে পথচলা, পথে একটা ছোট্ট জলাশয়ে এক নাম না জানা পাখির দেখা পেলাম, মনে হল ওটি গৃহপালিত। গ্রামটি বেশ বর্ধিষ্ণু, সকলেই দৈনন্দিন কাজ কর্মে ব্যস্ত। 



পথে আর সেরকম আকর্ষণীও কোন ঘটনা ঘটে নি। শেষের দিকে আর হাঁটতে ভাল লাগছিলো না, সন্দেশ ভাইকে বার বার জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম ‘আর কতদুর, আর কতদুর’, সন্দেশ ভাইও পাক্কা গাইডের মতন ‘আর একটু, আর একটু, এই দশ মিনিট, এই আর দুটো বাঁক’ বলে বলে প্রায় ঘণ্টা খানেক হাঁটিয়ে অবশেষে মাইমাজুয়া-এ পেমা দিদির বাড়িতে পৌঁছে দিল। শেষের দিকে তিনটি ছোট ছোট বিচ্ছুর সাথে পথে দেখা হল, তাদের সেদিন পরীক্ষা শেষ হয়েছে, ওদের চোখেমুখে পরীক্ষা শেষের আনন্দ আমাদের ছোটবেলা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। ওদের সাথে গল্প গাছা করে বেশ কিছু ছবি তুলে আমরা সেদিনের মতন হাঁটার বিরতি দিলাম।









পৌঁছনোর সাথে সাথে আতিথেয়তায় ভরিয়ে দিলেন পরিবারের সকল সদস্য। প্রাণখোলা হাসির সাথে অসাধারণ সব সুস্বাদু খাবারে মন ভরে গেল। খেতে বসে ওনাদের সাথে অনেক গল্প হল, আমি মিষ্টি খেতে ভালবাসি দেখে রসগোল্লা-ও পরিবেশন করলেন। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম পেমা দিদি কাছেই এক স্কুলের দিদিভাই আর ওই তিন বিচ্ছু ওনার স্কুলেই পড়াশোনা করে। তিন বিচ্ছুর মধ্যে অপেক্ষাকৃত যাকে শান্ত মনে হয়েছিলো, তার কথা বলতে পেমাদিদির কি হাসি, ব্যাপারটা সেই “ওরম মনে হয়” ।







খেয়ে দেয়ে আমরা পেমাদিদির বাগান দেখলাম ঘুরে ঘুরে, সুন্দর সুন্দর ফুলের সাথে সাথে সব্জির ক্ষেত রয়েছে যার পরিচর্যা পরিবারের সদস্যারা মিলেই করেন। গাছে গাছে কিউই (kiwi) ফলে আছে, ওনাদের অনুরোধে গাছ থেকে পেরে খেলাম কয়েকটা। এর আগে কোনোদিন খাইনি, প্রথমবার খেয়ে বেশ ভাল লাগলো। সন্ধ্যে নামতে ঘরে এসে লেপ মুড়ে বসে আড্ডা দিতে থাকলাম। গল্পের মাঝেই সন্ধ্যের পকোরা আর চা এসে গেলো, সোনায় সোহাগা যাকে বলে। 


গল্প করতে করতে যখন চোখ একটু একটু বন্ধ হয়ে আসছে তখন এলো রাতের খাবারের ডাক। এলাহি আয়োজন ডিনারে, সব কিছুর সাথে স্পেশাল ছিল ঘরে তৈরি ঘি, কি যে স্বাদ তার কি বলবো। 

পেট আর মন ভরে খেয়ে এসে এবার ঘুমের পালা, একটা ভীষণ ভালো দিনের সমাপ্তি ঘটলো।


মাই-মাজুয়া থেকে গরুওলেভঞ্জনঃ


ভোরবেলা পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল, আলো ফুটতে বাইরে এসে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে করতেই সকালের চা এসে হাজির। এরপর প্রাতরাশ সেরে পেমাদিদির পরিবারের সকলের সাথে ছবি তুলে আমরা গরুওলেভঞ্জন-এর দিকে রওনা দিলাম। 


গ্রামের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলা মাটি-পাথরের রাস্তা চলে গেছে। পথের ধারে কোথাও গাছে গাছে প্রচুর চাল কুমড়ো, কিছু আবার অবহেলায় মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। কোথাও ছোট্ট পাহাড়ি কুঁড়ে ঘরের সামনে পরিবারের ক্ষুদে সদস্যরা খেলা করছে; মাটির দাওয়া সুন্দর করে নিকোনো, উঠোনে রকমারি ফুলের গাছ। পথে একটা পরিত্যক্ত কাঠের দোতলা বাড়ি পড়লো, আমরাও সুযোগ বুঝে বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম। 



এরপর গাড়ির রাস্তা ছেড়ে একটু এবড়ো খেবড়ো নেড়া পাহাড়ি পথ ধরে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেদিনের প্রধান আকর্ষণ ‘ফুশ্রে’ লেকে পৌঁছে গেলাম। কি ভীষণ শান্ত নিরিবিলি জায়গাটা, লিডার আমাদের এখানে বেশ অনেকটাই সময় দেওয়াতে মনের আনন্দে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে লাগলাম। 


লেকের ওপারে দুটো বাচ্চা ছেলে মাছ ধরছিল, আমি ওদের ছবি নেওয়ার জন্য ওদিকে যত এগোচ্ছি তত ওরা আমার থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে। ওদের ধাওয়া করে পাহাড়ের মাথায় একটা ভিউ পয়েন্টে উঠে গেলাম, ওরা ততক্ষণে ওখান থেকে নেমে অন্যদিকের একটা জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে, কিছুতেই ওদের নাগাল পেলাম না। পুরো লুকোচুরি খেলে গেলো আমার সাথে। শেষে শুধু লেকের-ই একগাদা ছবি তুলে ফিরে এলাম। 



বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে বসে সময় কাটিয়ে আবার শুরু হল পথ চলা। এবারে চড়াই ভেঙ্গে ওপরের দিকে উঠতে উঠতে দেখতে পেলাম সেই দুই বিচ্ছু আবার ফিরে এসেছে মাছ ধরতে। সন্দেশ ওদের দেশোয়ালি ভাষায় হুমকি দিয়ে দিল, “মাছ ধরার ছবি তুলে নিয়েছি, এবার পুলিশ এ খবর দিতে যাচ্ছি”। ওর কাণ্ড দেখে আমি তখন কিছুতেই হাসি চাপতে পারছি না।


এবারে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ চলে গেছে, জঙ্গল এতোটাই ঘন যে সূর্যের আলো ঠিক মতন ঢুকতে পারছে না, তার ওপর অসময়ে মেঘ করাতে আবার জঙ্গলের মধ্যে মায়াবি এক আলো ছায়ার সৃষ্টি হয়েছে, অনেকটা বিদেশি ভুতের সিনেমায় যেমন দেখা যায়। ঠাণ্ডা-টাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে, বেশ একটা গা শিরশিরানি ভাব। হাঁটতে ভীষণ ভাল লাগছিল, জঙ্গলের সেই মিষ্টি গন্ধটা মাঝে মাঝেই নাকে ঝাপটা দিচ্ছিল। 


আজ আর সন্দেশ-কে জ্বালাতন করিনি “আর কতদুর, আর কতদুর” বলে বলে। হঠাৎ করেই জঙ্গলের রাস্তা শেষ আর মেঘ-ও পরিষ্কার হয়ে সামনে গুটিকয় ছোট ছোট টিনের বাড়ি দেখা যেতেই সন্দেশ উৎফুল্ল হয়ে জানালো আমরা গরুওলেভঞ্জন পৌঁছে গেছি আর আজকে রাতে আমরা সন্দেশের বাড়ির অতিথি। 


বাড়ি পৌঁছেই সন্দেশ রান্নাঘরে ঢুকে বাড়ির বড়দের সাথে রান্নায় সাহায্য করতে লেগে পড়লো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের খাবার তৈরি করে ডাক দিলো। রান্নাঘরটা বেশ বড়, একপাশে দুটো উনুনে রান্না চলছে, অন্যদিকে স্কুলের মতন বেঞ্চ পেতে খাওয়ার আয়োজন। খুব যত্ন সহকারে আমাদের খাবার পরিবেশন করা হল। খেতে খেতেই পরিচয় পর্ব সেরে নিলাম আমরা, সন্দেশের মা, বাবা, দাদা, দিদি, দাদু দিদা সকলের সাথে পরিচয় হল। সকলের আন্তরিক ব্যবহার মন ছুঁয়ে গেল। আলাপ হল আর এক গ্রুপ লিডারের সাথে, আমরা খাওয়া সেরে ওখানে বসেই আড্ডা দিতে থাকলাম। সন্ধ্যে বেলায় সন্দেশের মাসি এসে নাচে গানে আসর জমিয়ে দিলেন। 





মাঝে একবার বাইরে বেরিয়ে ছিলাম, রাতের পরিবেশ দেখতে, বাইরে তখন কনকনে ঠাণ্ডা, রান্নাঘরের ভেতরটা এতো গরম যে বোঝাই যাচ্ছে না। একটু রাত বাড়তে রাতের খাবার খেয়ে রীতিমত কাঁপতে কাঁপতে নিজেদের ঘরে ফিরলাম। পরদিন রাত তিনটের সময় উঠতে হবে, তাই বেশি রাত না করে অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়লাম। 


মনের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা, আগামি কাল অবশেষে তোমার সাথে দেখা হবে, ‘এবার সত্যি দেখা হবে তো? একে না বলে এসেছি, তুমি কতোটা কি ব্যস্ত কিছুই জানার সুযোগ হয়নি।‘ এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। 


‘সেই বিশেষ দিন’


রাত তিনটের সময় অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল, তার অনেক আগে থেকেই ঘুম পাতলা হয়ে গেছিল, সত্যি বলতে উত্তেজনায় সারা রাত ভালো করে ঘুমই হয়নি। 


কতদিন পরে তোমার সাথে দেখা হতে চলেছে, কি যে আনন্দ তখন কি বলবো, এসব তো তুমি কোনোদিন-ও বুঝবে না। শুধু আমাকে বকেই যাবে, আর তোমার সাথে দেখা করতে যেতে বারণ করবে। তুমি তো কোনোদিন- ও আসবে না, আমি না গেলে যে কোনোদিন আমাদের দেখা হবে না, সেটা আমার জন্য কি যে কষ্টকর, সে তুমি বুঝবে না। এক তরফা ভালবাসা যে কি কষ্টের সে কি বোঝো? 


যাই হোক, অনেক অভিযোগ করে ফেলেছি, এবার গল্পে আসি। 


আমরা ব্যাগ নিয়ে মাথায় টর্চ বেঁধে হাঁটতে শুরু করলাম, গন্তব্য চিন্তাফু টপ, এবারের পথ প্রদর্শক সন্দেশের দাদা। এতো গভীর অন্ধকারে এর আগে কোনোদিন হেঁটেছি বলে তো মনে পড়ে না, সম্ভবত এটাই প্রথম। একদিকে ঘন জঙ্গল বেশ বুঝতে পারছি, অন্য দিকে মনে হয় গভীর খাদ, তাই এপাস ওপাশ বেশি না গিয়ে ঠিক মাঝখান দিয়ে চলতে থাকলাম। লাইন দিয়ে চলছি আমরা, সবার সামনে গাইড দাদা, তারপর মৌমিতা, তারপর আমি আর একদম শেষে অরিন্দম।


পথ বলতে ধাপে ধাপে পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে, এই কদিন যে সব পথ অতিক্রম করে এসেছি, সেখানে ঝাকুনি খেতে খেতে চারচাকা বা দু চাকা চলতে পারলেও এখানে সে উপায় নেই। তবে খুব তাড়াতাড়ি একটা দু চাকা যাওয়ার রাস্তা তৈরি হচ্ছে, সেটা গাইড দাদা একবার দেখিয়ে দিলেন। 


আমরা ঘড়ি দেখছি, আর হাঁটার গতি বাড়াচ্ছি, কারণ সূর্যোদয়ের আগে আমাদের পৌঁছতেই হবে। 

আমি তো এপাশ ওপাশ কিচ্ছু দেখছি না, আমার একমাত্র লক্ষ্য এখন চিন্তাফু টপ। একসময় অরিন্দম বাঁ পাশের দিকে দেখাতে দেখি, ওপরে আকাশ জুড়ে অসংখ্য ঝিকিমিকি তারা, আর দিগন্ত রেখায় হাল্কা আলোর রেখা দেখা দিচ্ছে। তারা গুলির ছবি তোলার বৃথা চেষ্টা করে যখন কিছুই পেলাম না তখন আবার হাঁটায় মন দিলাম। 


এবার হাল্কা হাল্কা মানুষের গলার আওয়াজ পাচ্ছি, আমাদের বেরোনোর আধা ঘণ্টা আগে দুই কাকুর এক ছোট দল আমাদেরই হোটেল থেকে বেরিয়েছেন, সম্ভবত ওনাদের গলার শব্দ। এরপর গাইড দাদার হাঁটার গতি কমে যেতেই বুঝলাম আমরা পৌঁছে গেছি। 


তখনও সূর্যোদয় হতে একটু বাকি আছে, তাই ওখানে এক নির্মীয়মাণ ঘরে আগের গ্রুপের তিনজন অপেক্ষা করছিলেন। আমার তো তর সইছে না, একটা মুহূর্ত- ও আমি নষ্ট করতে চাই না, তাই ঘরে না থেকে সোজা চলে গেলাম টপে। 


যাওয়ার পথে বাবা মহাদেবের দর্শন পেয়ে, প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে গেলাম একদম সামনের দিকে, যাতে সুজ্জি মামা উঠলেই আগে তোমার দেখা পাই। 


এখানে একটা বিষয় জানিয়ে রাখি, চিন্তাফু টপ কোন একটুখানি জায়গা নয়, বেশ অনেকটা লম্বা এক জায়গা, যেখানে ছোট ছোট জংলি ঝোপের মাঝখান দিয়ে এক পায়েচলা পথ, ঝোপের গাছ গুলোর মাথায় বরফ জমে আছে। হু হু করে কনকনে হাওয়া বইছে, ছবি তোলার জন্য গ্লোভস থেকে হাত বার করলেই হাত অসাড় হয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েকবার এরকম বৃথা চেষ্টা করার পর অরিন্দম ওর নিজের গ্লোভস-টা আমায় দিল। বিশেষ গ্লোভস ওটা, মাথার দিকে শুধুমাত্র আঙ্গুল গুলোর জন্য আলাদা ঢাকার ব্যবস্থা, শুধু সেই অংশ টুকু খুলে টুক করে ছবি তুলে আবার ঢাকা দিয়ে দিলেই হল, পুরো হাতটা খুলতে হচ্ছে না। 


সব আয়োজন করে এবার অপেক্ষার পালা। আকাশে তখন নানা রঙের খেলা, একদম নিচের দিকটা ঘন কালো, তারপর এক সরু কমলা রেখা, তারপর হলুদ, তারপর গোলাপি, তারপর নীল, নীলের পরে আবার ঘন কালো। কি অদ্ভুত না? এতদিন পরে এতো পুঙ্খানুপুঙ্ক রঙের বর্ণনা মনে থাকার কথা নয়, ভাগ্যিস ওই বিরল মুহূর্তের কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দি করে নিয়েছিলাম, মহাদেবকে সাক্ষি রেখে। 



টুকটুকে লাল বলের মতন সুজ্জিমামা একদিকে উঁকি দিলেন আর সেই আলোয় আলোকিত হয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা তাঁর বিশাল পরিবার নিয়ে দৃশ্যমান হলেন। কি সেই রুদ্ররূপ, সম্মোহিতের মতন তাকিয়ে আছি সমস্ত বিশ্বসংসার ভুলে। হঠাৎ খেয়াল হল ‘কিছু ছবি তুলতে হবে যে, এই রূপের সিকিভাগ একটু ক্যামেরায় বন্দী করে নিয়ে যাই।‘ ছবি তুলতে গিয়ে দেখি মহা বিপদ, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ব্যাটারি আর কাজ করছে না, ট্যাঁ ট্যাঁ করে জানান দিচ্ছে ‘আমি জমে গেছি তো, আর আমার ছবি তোলার ক্ষমতা নেই’।

 

কি আর করবো, তখন সেই ফোন – ই ভরসা, তাতে কটা ছবি তুলে নিয়ে যখন হাত প্রায় অসাড় ছুটলাম সেই ঘরটায়, ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া থেকে বাঁচতে। ঘরে গিয়ে দেখি দুই গাইড দাদা এরমধ্যে কোথা থেকে কাঠকুটো যোগাড় করে কোনোরকমে একটু আগুন জ্বালিয়েছেন, সেই আগুনে সকলে হাত সেঁকছেন। আমার কি মনে হল, ব্যাটারি বার করে অল্প অল্প আগুনের তাপ দিতে থাকলাম, অনেকটা আরতির তাপ যেভাবে নেওয়া হয়, সেরকম। এক কাকু তো হেসেই ফেললেন এরকম দেখে, তাও আমি হাল ছাড়লাম না। কিছুক্ষণ বাদে আবার ব্যাটারি চাঙ্গা হয়ে উঠলো, আমিও দৌড়লাম ছবি তুলতে। 


ততক্ষণে কাঞ্চনজঙ্ঘা লাল থেকে কমলা রং ধরে এবার হলুদ আবিরে মাখামাখি। কি যে সুন্দর লাগছে তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না, ছবিতেও তার সামান্য প্রকাশ-ই ঘটবে, আসল তো মনের মধ্যে বন্দী হয়ে রইলো। 

তুমি যে কি ভীষণ রেগে গেছ, আমি খুব বুঝতে পারছি, কিন্তু আমি যে তোমার সেই রুদ্ররূপ মুগ্ধ হয়ে দেখছি, কতদিন পর তোমায় দেখলাম বলো!! 


খুব তো ফন্দী এঁটেছিলে ছবি তুলতে দেবেনা বলে, সেই অন্নপূর্ণার মতন, এবারে সেই ফন্দীও কাজ করলো না। অনেক অনেক ছবি তুলে এনেছি, এবারে যে বাবা মহাদেব আমার সাথে ছিলেন। 


এতদিন অবধি একটা কেমন ঘোরের মধ্যে ছিলাম, হঠাৎ গিয়ে তোমাকে চমকে দেওয়ার উত্তেজনা আর সাথে ভয় ‘এবার সত্যিই দেখা হবে তো’, অন্য এক জগতে ছিলাম যেন। এবার আসতে আসতে যেন এই জগতে ফিরে আসছি। 


সেদিন আমাদের কপাল ভীষণ ভালো ছিল, একদিকে যেমন কাঞ্চন দাদার পরিবার বর্গের দেখা পেলাম, ওপর দিকে এভারেস্ট, লোৎসে, মাকালু পরিষ্কার দৃশ্যমান। সবাই বলে সান্দাকফু থেকে বেশি ভাল দেখা যায়, আমি বলবো চিন্তাফু থেকে সব থেকে ভাল দর্শন হয়। 


অনেক অনেক ছবি তুলে যখন সূর্যরশ্মি সাদা বরফে পড়ে ঠিকরে আসতে শুরু করলো তখন আমরা ফেরার পথ ধরলাম। সত্যি বলতে আমার আরও কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে ছিল। কতদিন পর তোমার সাথে দেখা, আবার যে কবে, কোথায়, কোন পরিস্থিতিতে দেখা হবে তার তো কোন স্থিরতা নেই, তাও সকলের সাথে ফেরার পথ ধরলাম। 


এবারে ক্রমাগত সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে যাওয়া, সকলেই চুপ চাপ নেমে চলেছে, আসলে সকলেই কম বেশি ঘোরের মধ্যে রয়েছে। বেশ কিছুটা নামার পর ‘তাল পোখরি’ পড়লো। এই লেকের বিশেষত্ব হল, ‘স্লিপিং বুদ্ধার’ প্রতিচ্ছবি এই সরবরে দৃশ্যমান হয়। যদিও একদিকের জল ঠাণ্ডায় জমে যাওয়াতে আমরা সেই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হতে পারিনি, তবে মার্চ-এপ্রিল বা অক্টোবর-নভেম্বরে গেলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে পারে। 



এবার আর বিশেষ এদিকে ওদিক সময় নষ্ট না করে নিচের দিকে নামতে থাকলাম, বেশ কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা সন্দেশের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। হাতে সময় খুব কম, অনেকটা পথ আবার যেতে হবে, তাই চটজলদি প্রাতঃরাশ সেরে, সন্দেশের পরিবার বর্গের সাথে অনেক ছবি তুলে, ওনাদের থেকে বিদায় নিয়ে এবার ‘আল’-এর দিকে যাত্রা শুরু হল। 


গরুওলেভঞ্জন থেকে আলঃ


সন্দেশ আর আমাদের সাথে এলো না, এবারের পথ প্রদর্শক ওর দাদা। আমার তো শুরু থেকেই হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। এক তো শরীর সায় দিচ্ছে না আবার সাথে মন-ও বেঁকে বসেছে। মন বলছে ‘এখান থেকে চলে গেলে আর কোনোদিন তোমার সাথে দেখা হবে না’, কি জানি কি একটা কুসংস্কার।  

রাস্তা ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে গেছে, আজ আমাদের প্রায় ২০০০ ফুট মতন ওপরে উঠতে হবে, বেশ চাপের ব্যাপার। শুরুর দিকে অল্প স্বল্প গাছপালা থাকলেও পরের দিকে ঢালু হলদে হয়ে যাওয়া ঘাসজমি-ই একমাত্র চলার পথ, আমরা গাড়ির রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের ঢাল ধরেই হাঁটতে লাগলাম। মাঝে মাঝে একটা দুটো পরিত্যাক্ত পাতায় ছাওয়া কুঁড়ে ঘর পড়ছে, কোন এক সময় এখানে হয়তো মানুষের পদ ধূলি পড়েছিল। মাথার ওপর চড়া রোদ, এক ঝাঁক চিল বা শকুন উড়ছে চক্রাকারে, কিরকম বিষণ্ণ এক পরিবেশ। আমরা চারজন ছাড়া আর কোন জন মনিষ্যি নেই আশেপাশে। 





বেশ অনেকটা ওপরে ওঠার পর এবার একটা দুটো করে গুরাস (rhododendron) – এর দেখা মিলতে থাকলো, এবার কিছু গৃহ পালিত চমরী গাই ও পথের ধারে বসে থাকতে দেখলাম। 


অনেকক্ষণ হাঁটা হয়েছে, সকলেই বেশ ক্লান্ত, খিদেও পেয়েছে কম বেশি। অরিন্দম আবার সেই ছোট্ট ওভেনে ঝটপট ম্যাগি বানিয়ে ফেললো, গাছের পাতা হল চামচ, এসব একমাত্র ট্রেকে গেলেই সম্ভব, কত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। ছোট্ট একটা পিকনিক শেষে আবার শুরু পথ চলা। এবারে পথের সঙ্গী গুরাস, প্রচুর প্রচুর গুরাসের সারী, মার্চ এপ্রিলে এলে এখানে রংবাহারি ফুলের মেলা বসে যাবে। 


হঠাৎ মৌমিতা আমাদের বাঁদিকের পাহাড়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলো, দেখি কাঞ্চন দাদার পরিবারবর্গ দৃশ্যমান আর আকাশের একফালি মেঘ এমন ভাবে মাথায় চেপে বসেছে অনেকটা ‘প্রফেসর শঙ্কূ-র’ মতন দেখতে লাগছে। দেখে বেশ মজা লাগলো আর নিজেদের কল্পনা শক্তির প্রশংসা নিজেরাই একটু করে নিলাম। 


এবারে বাকি পথ পুরোটাই কাঞ্চন দাদা আমাদের সাথে সাথে চলেছেন। অনেক উঁচুতে বেশ কিছু টিনের চালা দেখা যেতে অরিন্দম জানান দিল ওটাই ‘আল’। আমার শরীর একদম চলছে না, পিছিয়ে পড়ছি বার বার, আমার জন্য অরিন্দম-কেও পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে, আমার বেশ খারাপ লাগছে, বার বার বলছি এগিয়ে যেতে। 


আমাদের যেখানে রাত্রিবাসের আয়োজন সেটা একদম ভিউ পয়েন্টের কাছে, ফলে সবচেয়ে উঁচুতে। তার আগে একটা দুটো ঘর দেখে আমি পারলে ওখানেই ঢুকে যাই, এমন হাল আমার। বিশাল ধৈর্যের সাথে ভুলিয়ে ভালিয়ে অরিন্দম শেষে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতেই কি যে শান্তি কি বলবো। 


একটু ফ্রেশ হয়ে বসলাম পপকর্ণের গামলা নিয়ে, এক গামলা তো নিমেষে শেষ, আরো একটুর জন্য আকুল আবেদন করতে অরিন্দম নিজে গিয়ে বানিয়ে নিয়ে এলো। বাইরে বেশ হইহল্লা চলছে ভিউ পয়েন্টে, ঘরে বসেই বুঝতে পারছি বেশ জনসমাগম হয়েছে, ভিড়ে আমার বিশাল অ্যালার্জি, তাই বাইরের দিকে পা বাড়ালাম না। 


ঘরে বসে একটু বিশ্রাম আর গল্প করতে করতেই রাতের খাবারের ডাক পড়লো। চিকেন, পর্ক মিলিয়ে বেশ এলাহি আয়োজন আর সাথে সেই আন্তরিকতা। খাওয়া দাওয়া সেরে এবারে ঘুমের পালা, বিছানা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। 


আল থেকে সান্দাকফু হয়ে শ্রীখোলাঃ


ভোরবেলা ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না, তাই সূর্যোদয়টা আর দেখা হল না। যখন বাইরে বেরলাম, সুজ্জিমামার তেজ এতো বেড়ে গেছে যে আর তাকানো যাচ্ছে না, আর সামনের তুষার শৃঙ্গ গুলি ধপধপে সাদা, ভোরের সেই রঙের খেলা এদিন আর দেখা হয়নি। একটু বেলায় খেয়েদেয়ে পিঠে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। 




কিছুটা চড়াই ভেঙ্গে ওপরের দিকে এগোতেই সান্দাকফু পড়লো, তার মানে আমরা নেপাল থেকে আমাদের দেশে ঢুকলাম। বছর ছয়েক আগে একবার এসেছিলাম এই সান্দাকফু, তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর কোনোদিন ও এখানে পা রাখবো না, এতো জঘন্য লেগেছিল যে কি বলবো। 


এবারে তুলনামূলক ভাবে ভিড় কম দেখলাম। আমরা সান্দাকফু পেরিয়ে এবার এক জঙ্গলের পথ ধরলাম। এই পথ ধরেই সেবারও আমরা নিচে নেমেছিলাম। 


বেশ ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই পথ, এখানে গুরাসের সাথে সাথে বাঁশ গাছের জঙ্গলও চোখে পড়লো। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে শ্বেত শুভ্র ‘স্লিপিং বুদ্ধা’ দৃশ্যমান হচ্ছেন। মাঝে একটা বড় মাঠের মতন জায়গা পড়লো, তার পাশে একটা ছোট টিনের চালার বাড়ি। আমরা কল্পনা করলাম রাতের বেলা এই ঘন অরণ্যের মধ্যে কোন অরণ্য দেব রাত্রিবাস করেন কে জানে। 



সেই মাঠ ছেড়ে আবার ঘন জঙ্গল, এবারে জঙ্গলের মধ্যে কোন প্রাণীর উপস্থিতি টের পেয়ে অরিন্দম সকলকে একসাথে চলতে বললো। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে প্রাণীটিকে বৃথা খোঁজার চেষ্টা করে আমরা আবার এগিয়ে চললাম। 


এদিনের পথের দৈর্ঘ্য সব থেকে বেশি ছিল, প্রায় ২০ কিমি, তাই নেমেই চলেছি, শেষ যেন হয়না। এবার পড়লো গুটিকয় ছোট ছোট সুন্দর বাগান ঘেরা বাড়ি নিয়ে ছোট্ট গ্রাম গুরদুম। এখানে ছোট করে ম্যাগি দিয়ে পিকনিক সেরে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু। নিচ থেকে জলস্রোতের আওয়াজ বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরা প্রায় এসে গেছি। 


ভ্রম কাটল নদীর ওপরের সাঁকো পেরোনোর পর, মোটেই পথ শেষ হয়নি,এখনও বেশ কিছুটা বাকি। আরও এক কিলোমিটার মতন রিম্বিক গ্রামের মধ্যে দিয়ে চলে অবশেষে আমরা শ্রীখোলা পৌঁছলাম, এখানেই আমাদের হাঁটার সমাপ্তি ঘটলো। 


সন্ধ্যে বেলায় আমাদের ঘরে আড্ডা বসলো, আমাদের দুজনের হাতে অরিন্দমের তত্ত্বাবধানে গাইড দাদা  শংসাপত্র তুলে দিলেন। 



এরপর ডিনার সেরে ঘুম, ‘অদ্যই শেষ রজনী’।


পরদিন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে টর্চ জ্বেলে শ্রীখোলা ব্রিজ থেকে শিলিগুড়ির গাড়ি ধরে ১০ টা নাগাদ শিলিগুরি পৌঁছলাম।


অন্যবারের মতন এবার এখানেই লেখা শেষ না করে এক নতুন অভিজ্ঞতার কথা ছোট করে লিখেই ফেলি। 

আমি এদিনের ট্রেনের টিকিট না পাওয়াতে পরদিনের প্লেনের টিকিট কেটেছিলাম আর রাত্রিবাসের জন্য গুগুল থেকে খুঁজে এয়ারপোর্ট – এর কাছে ‘হিম্মৎ গুড়ি’ নামের একটি ফার্ম হাউস বুক করেছিলাম। জীবনে প্রথমবার কোন অচেনা জায়গায় একা রাত্রি বাস করতে চলেছি, মনের মধ্যে বেশ একটা ভয় ভয় ভাব। 

‘হিম্মৎ গুড়ি‘-তে পৌঁছে নবীন দাদা আর কুশল দিদির আন্তরিকতায় সমস্ত ভয় নিমেশে উধাও হয়ে গেল। অনেক অনেক গল্প আড্ডা আর কুশল দিদির হাতের সুস্বাদু রান্না মন ভুলিয়ে দিলো। 



এবারের মতন চিঠি-টা এখানেই শেষ করছি, সব কিছু গুছিয়ে বলতে গিয়ে অনেক বড় করে ফেললাম, একটু ধৈর্য ধরে পড়ো আর প্লিজ রেগে থেকো না।  

ভালো থেকো। 


----


*** হিমালয়ান প্যাশন-এর সকল পরিবারবর্গ- কে অনেক অনেক ধন্যবাদ, ভবিষ্যতে তোমাদের সাথে আরও অনেক ট্রেক করবো, এই আশাই রাখি। 

140 views0 comments

Recent Posts

See All

Comments


bottom of page